লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশ

স্বামী সোমেশ্বরানন্দ

মায়ের প্রতিমার উপরে সামান্য বাঁ-দিকে শিবের মুখ। মাটির নয়, ছবিতে। সুপ্ত শক্তির প্রতীক। আর মা দুর্গা সক্রিয় শক্তি। তাৎপর্য, প্রতি ব্যক্তির মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসীম শক্তি। পুজোর উদ্দেশ্য শক্তিসাধনা, নিজের সুপ্ত শক্তিকে জাগানো। তাই বোধন শুধু মায়ের নয়, আমাদের সবারই জেগে ওঠা।
কিন্তু কিভাবে কি রূপে এই শক্তির প্রকাশ ঘটাতে হবে? এটাই দেখা যায় চার ভাই-বোনের মাধ্যমে। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ। আর তাদের বাহনের প্রতীকে।

সরস্বতী জ্ঞান শক্তির দেবী। জ্ঞানের স্রষ্টা। আমরা স্কুল-কলেজে জ্ঞান সংগ্রহ করি, সৃষ্টি করি না। তাই আমাদের বিদ্যা, জ্ঞান, পাণ্ডিত্য, সব ধার-করা সম্পদ। Second-hand, টেপ-রেকর্ডার হয়ে উঠি আমরা। নতুন সমস্যায় প্রয়োগ করি পুরনো সমাধান, নতুন প্রশ্নে দিই পুরনো উত্তর। তাই সংকট দূর হয় না। জ্ঞান-সংগ্রাহক থেকে জ্ঞান-উৎপাদক হয়ে উঠতে হবে আমাদের। নাহলে কম্প্যুটার রোবট বাতিল করে দেবে মানুষকে। মা সরস্বতী এটাই শেখাচ্ছেন।
তাঁর বাহন রাজহাঁস। হাঁস মাটিতে হাঁটে, জলে সাঁতার কাটে, আকাশে ওড়ে। স্থলে, জলে, আকাশে তার গতি। কিন্তু আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি সংকীর্ণ। ফিজিক্সের পন্ডিত হলে অর্থনীতি বুঝি না, সাহিত্যের ছাত্র হলে বায়োলজিতে উৎসাহ নেই, গণিতের ডক্টরেট হলে আধুনিক কবিতায় আনন্দ পাই না। আমি শুধু মাটিতে হাঁটি, কিংবা জলে ভাসি, বা আকাশে উড়ি। মুক্তির পথ, রাজহাঁস হওয়া। মানব চেতনা যে নানা-ভাবে আত্মপ্রকাশ করে নানা রূপে, সে-বিষয়ে সচেতন হতে হবে, আনন্দ অনুভব করা, এই তো চিত্তমুক্তির পথ। শ্রীরামকৃষ্ণ তাই বলতেন, ‘যাবৎ বাঁচি তাবৎ শিখি।’

লক্ষ্মী সম্পদের দেবী, স্রষ্টা। জ্ঞানের মতো সম্পদও সৃষ্টি করতে হয় ব্যক্তিজীবনে। আজকের সমস্যা, আমরা বাবু-চাকরি চাই, বুদ্ধিজীবি হওয়ার খুব সখ। টিভিতে, কাগজে, ক্যান্টিনে উপদেশ দেবো অন্যদের, কিন্তু নিজে কাজ করবো না। নিজে সম্পদ সৃষ্টি করি না। অন্যের সম্পদে বড় হতে চাই। কেউবা নতুন চিন্তা করি, কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ করে দেখাই না। মা লক্ষ্মীর পথে আমরা ব্যক্তিজীবনে যদি সম্পদ স্রষ্টা হয়ে উঠি তবেই পুজো সার্থক।
মা লক্ষ্মীর বাহন প্যাঁচা। পশু-পাখির মেরুদণ্ড জমির সমান্তরাল (parallel), শুধু প্যাঁচাই সোজা হয়ে বসে মেরুদণ্ড vertical রেখে। অর্থাৎ সততাকে আশ্রয় করেই সম্পদ সৃষ্টি করতে হবে, খরচও। নাহলে দেখা দেবে ব্যাঙ্ক-দুর্নীতি, কাটমানি, পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি। অন্য সব প্যাঁচা নানা রঙের, কিন্তু লক্ষ্মীপ্যাঁচা সাদা (সততা)।

কার্তিক দেব-সেনাপতি। শৌর্যের দেবতা। তিনি আমাদের শেখাচ্ছেন সবল হতে। আমরা দুর্বল বলেই তো দুঃখ পাই, হেরে যাই, অন্যায় সহ্য করি। পুজোর উদ্দেশ্য শক্তিশালী হয়ে ওঠা।
তাঁর বাহন ময়ুর। সুন্দর পাখি। কেন এমন বাহন? শৌর্য তো গুণ্ডা-মাফিয়ারও আছে। কিন্তু সেই শক্তি কুৎসিত, অত্যাচারী। এখানে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, শৌর্য যেন সুন্দর হয়। সমাজের কল্যাণে এর প্রয়োগ করতে হবে।

গণেশ বা গণপতি। জনগণের শক্তির প্রতীক তিনি। দুর্গাপুজোর উদ্দেশ্য শুধু নিজের বিদ্যা, সম্পদ, শৌর্যের জন্য নয়, মানুষের জন্যও। নিজের পাণ্ডিত্য সম্পদ ক্ষমতা ও শক্তিকে ছড়িয়ে দিতে হবে মানুষের মাঝে। এটাই গণেশের তাৎপর্য।
তাঁর বাহন ইঁদুর কেন? ইঁদুর ছোট্ট প্রাণী কিন্তু দ্ক্ষ নিজের কাজে (খাবার খোঁজা, দৌড়ানো, লম্বা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে থাকার ব্যবস্থা, দিনে-রাতে শিকারে দক্ষ)। সাধারণ মানুষ, বিশেষত গরিব, তারাও তেমনি কোনো-না-কোনো বিষয়ে দক্ষ। তাদের সেই শক্তিকে আরও জাগিয়ে তুলতে হবে, সশক্তিকরণ (empowering) দরকার। তাহলেই জনগণের, সমাজের, উন্নতি হবে। সমাজ শক্তিশালী হবে।

এভাবে দুর্গাপুজোর বহুমাত্রিক রূপ দেখানো হয়েছে প্রতিমার মাধ্যমে। মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন সাধকেরা। এই পুরো ছবিটা মনে রাখলে পুজো সার্থক হয়ে উঠবে।

মন্তব্য করুন