কালী- মহানির্বাণতন্ত্র

করালবদনা — মহাকাল এই বিশাল বিশ্বকে ধ্বংস করেন। সেই মহাকালকেও যিনি গ্রাস করেন তিনি কালী — ‘মহাকালস্য কলনাৎ ত্বমাদ্যা কালিকা পরা।।’ (মহানির্বাণতন্ত্র ৩৪। ৩০-৩২) দেবীভাগবতেও বলা হয়েছে : ‘কালী কলয়তে সর্বং ব্রহ্মান্ডং সচরাচরম্।। (৩।২৭। ৫৭) তিনি সমস্ত ব্রহ্মান্ডকে গ্রাস করেন কল্পান্তসময়ে, মহাকালকেও গ্রাস করেন বলে তিনি করালবদনা।

তিনি ঘোরদংষ্ট্রাং — তাঁর প্রতিমায় দেখি তিনি লেলিহান রক্তবর্ণের জিহ্বা শুভ্রদন্তে দংশন করছেন। দন্তের শুভ্রতা সত্ত্বদন্তের সূচক এবং ঘোর বা বিশাল দন্ত সত্ত্বগুণের আধিক্য সূচনা করে। লোলজিহ্বার রক্তবর্ণ রজোগুণের ইঙ্গিত দেয়। কালীমূর্তিকে নিয়ে অনেক কাহিনী প্রচলিত। তার মধ্যে একটি হল মা ত্রিগুণময়ী। দানবজয়ী মায়ের মধ্যে তমো ও রজোগুণের আধিক্য দেখা দিলে তিনি সংহারমূর্তিতে দেবতাদেরও ধ্বংস করতে ধাবিত হলেন। ভয়ত্রস্ত দেবগণ তখন মহাদেবের শরণ নিলেন। মহাদেব মায়ের সামনে না এসে তাঁর চলার পথে শব হয়ে শুয়ে রইলেন। মহাদেব বিশুদ্ধসত্ত্বমূর্তি। মায়ের চরণ তাঁর অঙ্গে ঠেকতেই মায়ের মধ্যে তিনগুণের সামরস্য এসে গেল। মা সত্ত্বগুণের প্রতীক দন্ত দিয়ে রক্তবর্ণের রজোগুণের প্রতীক জিহ্বাকে সংযত করে নিলেন। তাঁর গতিও স্তব্ধ হল। সদাশিবের সঙ্গে যোগযুক্ত হয়ে মা স্থির হয়ে গেলেন।

তিনি শবকর্ণভূষণা — দুটি শিশুর শব দেবীর কর্ণভূষণ। এটি একটি রহস্যের ইঙ্গিত দেয়। শিশুর মতো সরলু, নির্বিকার সাধকই দেবীর অতিপ্রিয়। তাকে তিনি কর্ণভূষণ করে সঙ্গে রাখেন।

মা মুন্ডমালিনী — মুন্ডমালা তাঁর কর্ণভূষণ। এই মুন্ডমালাটি পঞ্চাশৎ মাতৃকাবর্ণের প্রতীক। অর্থাৎ দেবী শব্দব্রহ্মময়ী। সমস্ত মাতৃকাবর্ণগুলি নামরূপাত্মক শব্দ-অর্থময় এই জগতের প্রতিনিধি। মহাপ্রলয়ের সময় মা ওই শব্দময় সৃষ্টির বীজ কুড়িয়ে রাখেন। সেই ওঙ্কারময়ী শব্দব্রহ্মময়ী দেবী থেকেই আবার সৃষ্টি হয়। অন্যভাবে বলা যায়, কালী সমস্তদেবময়ী। প্রতিটি মাতৃকাবর্ণেই দেবতাদের বীজমন্ত্র তৈরী হয়। সুতরাং সমস্ত দেবতাই সূক্ষ্মরূপে কালীর মধ্যে নিহিত আছেন। আবার কারও মতে, দানবদলনী দেবী দানবদের মুন্ডগুলিও মালা করে পরেন —তিনি একই সঙ্গে শুভশক্তি ও অশুভশক্তির উৎসস্বরূপা। ভালোমন্দে মেশানো জগৎ তাঁরই সৃষ্টি, তাঁরই বিভূতি।

দেবী চতুর্ভুজা — দেবীর চারটি বাহু বৃত্তের অন্তর্গত চতুর্ভুজের মতো তাঁর অখন্ড স্বরূপের ইঙ্গিত বহন করে। দেবীর বাম-ঊর্ধ্ব হাতে শাণিত কৃপাণ বা খড়্গ। সেই জ্ঞান-খড়্গে তিনি সাধকদের মায়া-মোহপাশ ছেদন করেন। নিচের হাতে নরমুন্ড। সমস্ত তত্ত্বজ্ঞানের আধার মস্তক। দেবী নির্মোহ, নিরাসক্ত সাধককে তত্ত্বজ্ঞানই শুধু প্রদান করেন না, তাঁর কল্যাণহস্তে সর্বদাই সাধককে ধরে রাখেন আপন সান্নিধ্যে।

দেবীর ডানদিকে হস্তদ্বয় বর ও অভয়মুদ্রা। তিনি শরণাগত সকাম সাধককেও অভয় ও তার অভীষ্ট বর দান করেন। মহাকালীর পদতলে কালরূপী মহাকাল নিষ্ক্রিয় হয়ে শায়িত। অর্থাৎ মহাকাল কালীর অধীন, তাঁর আশ্রিত ।

বিপরীত – রতাতুরা শব্দটি মানবিক মিলনকে ইঙ্গিত করলেও এখানে একটি নিগূঢ় তত্ত্বের ব্যঞ্জনা আছে। সমস্ত সিদ্ধবিদ্যা, মহাবিদ্যাদের মধ্যে দক্ষিণাকালী একই সঙ্গে প্রকৃতি ও পুরুষ। এইভাবেরই ইঙ্গিত দিয়েছেন শ্রীরামকৃষ্ণ, “… যখন তাঁর নির্গুণ স্বরূপকে অভিভূত করে লীলা করেন, সৃষ্টি ইত্যাদি করেন তখন শিব নির্বিকার, কার্যের অতীত হয়ে থাকেন। দেবীর সক্রিয় ভূমিকাটি বোঝাতে বিপরীত-রতাতুরা শব্দের প্রয়োগ ।

দেবী শ্মশানবাসিনী, শবশিবাসঙ্গিনী। শ্মশানে সমস্ত জীবের স্থূলদেহ ভস্মীভূত হয় — এখানেই সংহারকারিনী কালীর আবাস। শ্মশানের চিতাগ্নি মৃতদেহ আত্মসাৎ করে। গুপ্তসাধনতন্ত্রে বলা হয়েছে —

“বহ্নিরূপা মহামায়া সত্যং সত্যং ন সংশয়ঃ।
অতএব মহেশানী শ্মশানলয়বাসিনী।।”

— দক্ষিণাকালী ওই চিতাগ্নিস্বরূপা। তাই তিনি শ্মশানবাসিনী। সাধকের চিত্ত যখন কামনা-বাসনার অগ্নি নির্বাপিত হয়, তখন সেই শ্মশানসদৃশ হয়ে দেবী আবির্ভূত হন ।সাধক গেয়েছেন —

“শ্মশান ভালোবাসিস বলে শ্মশান করেছি হৃদি।
শ্মশানবাসিনী শ্যামা, নাচবি সেথা নিরবধি।।”

কালী শিবাগণে পরিবৃতা। চন্ডীতে আছে — দেবীর অঙ্গ থেকে শত শত নিনাদিনী শিবা নির্গত হনূ।তিনি শবশিবাসঙ্গিনী অথচ তিনি প্রসন্নবদনা, হাস্যময়ী, সন্তানবৎসলা। মায়ের এই স্থূলরূপের ভাবনা বা ধ্যানের দ্বারা মানুষের চিত্ত মোক্ষের অভিলাষী হয়। তাঁর সূক্ষ্মতত্ত্ব বাক্যমনের অগোচর।

মন্তব্য করুন