
পূর্বকালে দ্রাবিড়দেশে বুদ্ধ নামে এক ব্রাহ্মণ বাস করতেন। তাঁর পত্নী ছিল খুবই দুষ্টা প্রকৃতির এবং দুরাচার সম্পন্না। ঐ পত্নীর সংসর্গে থাকার ফলে ব্রাহ্মণের আয়ু ক্ষয়প্রাপ্ত হতে হতে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হলেন। পতীর মৃত্যুর পরে ঐ পত্নীটি আরও বিশেষভাবে ব্যভিচারে লিপ্ত হলো। এমনকি লোকনিন্দার ভয় না করে সে নির্লজ্জের মতো ব্যবহার করতে লাগল। তার কোনো পুত্র বা ভাই ছিল না। সে সর্বদাই ভিক্ষার অন্ন ভোজন করত। নিজের হাতে প্রস্তুত না করে সর্বদাই পরের বাড়ি থেকে ভিক্ষা করে বাসি অন্ন ভোজন করত এবং অনেক সময় অপরের বাড়িতে রান্না করতে যেত, সেখান থেকে অন্ন জুটিয়ে নিত।
◆ তীর্থযাত্রা আদি থেকে সর্বদাই দূরে থাকত। সে কখনও কোনো ভালো কথায় কর্ণপাত করত না।
◆ একদিন এক বিদ্বান তীর্থযাত্রী ব্রাহ্মণ তার গৃহে উপস্থিত হল। যার নাম ছিল কুৎস। তাকে (ঐ পত্নীকে) ব্যভিচারে আসক্ত দেখে সেই ব্রহ্মর্ষি কুৎস বললেন ━ “ওরে মূর্খ নারী! মনোযোগ সহকারে আমার কথা শ্রবণ কর। পৃথ্বি আদি পঞ্চভূত দিয়ে তৈরী এই রক্তমাংসের শরীর, যা কেবল দুঃখেরই কারণ, তুই তাকে যত্ন করছিস? এই দেহ জলের বুদবুদের মতো, একদিন যা অবশ্যই বিনষ্ট হবে। এই অনিত্য শরীরকে যদি তুই নিজ বলে মনে করিস তাহলে নিজের বিচার পূর্বক এই মোহ পরিত্যাগ কর। ভগবান বিষ্ণুকে স্মরণ কর এবং তাঁর লীলাকাহিনী শ্রবণ কর। এখন কার্তিক মাস আগত হবে, তখন ভগবান দামোদরের প্রীতি বিধানের জন্য, স্নান, দান আদি কর্ম করে গৃহে বা মন্দিরে বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে দীপ নিবেদন করে শ্রীবিষ্ণুকে পরিক্রমা করবে এবং তাঁকে প্রণাম করবে। এই ব্রত বিধবা এবং সৌভাগ্যবতী নারী উভয়েরই অবশ্য পালনীয়। যার ফলে সমস্ত প্রকারের পাপের শাস্তি এবং সকল উপদ্রব নষ্ট হয়। কার্তিক মাসে দীপদান নিশ্চিতরূপে ভগবান বিষ্ণুর প্রীতি বর্ধন করে।
◆ এই কথা বলে ব্রাহ্মণ কুৎস অপর একটি গৃহে গমন করলেন। তখন ঐ ব্রাহ্মণী ব্রহ্মর্ষি কুৎসের এই রকম উপদেশ শ্রবণ করে নিজ কর্মের জন্য অনুতাপ করতে লাগল এবং সে স্থির করল যে সে অবশ্যই কার্তিক মাসে এই ব্রত পালন করবে। তারপর যখন কার্তিক মাস আগত হলো তখন সে পুরো মাস সূর্যোদয়ের সময় প্রাতঃস্নান তথা বিষ্ণুকে দীপদান সহ নিষ্ঠা সহকারে এই ব্রত পালন করল। তারপর কিছুকাল বাদে আয়ু শেষ হলে তার মৃত্যু হলো। তখন সে স্বৰ্গলোকে গমন করল এবং পরে মুক্তি লাভ করলেন।
যে সমস্ত মানুষ কার্তিক ব্রত পালন ও দীপদান আদি সম্পন্ন করে তারা যদি এই ইতিহাস শ্রবণ করে তাহলে তারাও মোক্ষ লাভ করে ।
꧁❀ দামোদর মাসে দীপদান মাহাত্ম্য কি? ❀꧂
✸ যিনি কার্তিকমাসে বিশেষত একাদশী ও দ্বাদশীতে অতি সুন্দর দীপমালিকা রচনা করেন, তিনি দশ সহস্র সূর্যতেজ সদৃশ জ্যোতিদ্বারা দশদিক্ আলোকিত করে জ্যোতির্ময় বিমানে জগৎ আলোকিত করে বিষ্ণুলোকে গমন করেন। ─── ভবিষ্যপুরাণ
✸ “কার্তিক মাসে যদি কোনো ব্যক্তি পরমেশ্বর ভগবান শ্রী কেশবের উদ্দেশ্যে একটি দীপ প্রজ্বলন করে থাকেন, তাহলে তিনি সকল যজ্ঞ এবং সমস্ত তীর্থে স্নান সম্পন্ন করার সুফল প্রাপ্ত হন।” ─── হরিভক্তিবিলাস ১৬ / ১০৪
✺ পদ্মপুরাণে কার্তিক প্রসঙ্গে বর্ণিত আছে ──✺
১। যে মনুষ্য কার্তিক মাসে উচ্চ আকাশে প্রদীপ দান করেন, তিনি সর্বকুল উদ্ধার করে বিষ্ণুলোক প্রাপ্ত হন ।
২। যে মনুষ্য কার্তিকে শ্রীবিষ্ণুর উদ্দেশ্যে আকাশে ও জলে দীপ দান করেন, তার যে ফল তা শ্রবণ করুন। হে বিপ্রগণ! এইভাবে যিনি দীপদান করেন, তিনি ধনধান্য, সমৃদ্ধিশালী, পুত্রবান্ ও ঐশ্বর্যশালী হন, তাঁর নয়নযুগল সুশোভন হয় এবং তিনি বিদ্বান হয়ে জন্মগ্রহণ করেন।
৩। কার্তিকমাসে বিপ্রগৃহে (বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের ঘরে) যিনি দীপদান করেন, মনীষিগণ বলেন ─ তাঁর অগ্নিষ্টোম যজ্ঞের ফল লাভ হয় ।
৪। চৌরাস্তায়, রাজপথে, ব্রাহ্মণ গৃহে, বৃক্ষমূলে, গোষ্ঠে (গোচারণভূমি), মাঠে, অরণ্যেও দীপদানে সর্বত্র মহাফল প্রাপ্ত হবে।
যিনি ভগবানের মন্দির আলো দ্বারা সজ্জিত করেন, সেই ব্যক্তি ভগবদ্ধাম তো প্রাপ্ত হন শ্রীহরিমন্দিরের বাইরে ও ভিতরে দীপমালা রচনা করেন, তিনি শ্রীবিষ্ণুর পার্ষদ হতে পারেন। যিনি শ্রীহরিমন্দিরে দীপমালা রচনা করেন, তার বংশে উদ্ভুত লক্ষপুরুষের নরক গমন হয় না। হে মুনে! শ্রীবিষ্ণুমন্দিরের বাইরে-ভেতরে যিনি দীপ প্রজ্বলন করেন, তিনি যখন ভগবদ্ধামে প্রবেশ করবেন তখন দেবতারা প্রদীপ হাতে সেই মহাত্মাকে বরণ করবেন। ─── স্কন্দপুরাণ
✸ “এমনকি যদি কোন মন্ত্র, কোন পুণ্যা কর্মফল এবং বিশুদ্ধতা নাও থাকে, তবুও যখন একজন ব্যক্তি দামোদর মাসে দীপদান করেন, তখন সবকিছুই পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়।” ─── হরিভক্তিবিলাস ১৬ / ১০৩
✸ পিতৃপক্ষে অন্নদান, গ্রীষ্মকালে জলদান দ্বারা যে ফল হয়, কার্তিক মাসে প্রদীপ দান কেন, অন্যের নিবেদিত প্রদীপও যদি কেউ উদ্দীপিত করে, তবে সেই ফল লাভ হয়।
হরিমন্দিরে অন্যের দানকৃত দীপকে যারা উজ্জ্বল করে অর্থ্যাৎ আলো বাড়িয়ে দেয়, তারা যম যন্ত্রণা থেকে নিস্তার লাভ করে। ─── হরিভক্তিবিলাস ১৬ / ১২৬-১২৮
একদিন কার্তিক একাদশীতে বিষ্ণুমন্দিরে রাত্রিবেলায় এক ইঁদুর প্রায় নিবন্ত প্রদীপের ঘি খেতে গিয়ে যেই মুখ লাগালো অমনি সলতে নড়ে গিয়ে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলতে শুরু করল। ইঁদুরটির মুখে দীপের আগুন লেগে গিয়ে ইঁদুর দেহত্যাগ করল। তারপর ইঁদুরটি সেই বিষ্ণুমন্দিরের পূজারীর কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করল। সেই কন্যাটি ভক্তিভরে, বিষ্ণুমন্দিরের মার্জনাদি কর্ম এবং বিষ্ণুর জন্য ফুল সংগ্রহ, মালা বানিয়ে নিবেদন করা প্রভৃতি সেবায় যুক্ত হলো। মনুষ্য জন্মের অন্তিম লগ্নে বিষ্ণুলোকে গমন করল। এই হলো পরের প্রদীপ নিবেদন করার ফল।
✸ “কেউ যদি এই দামোদর মাসে ভগবানের উদ্যেশ্য দীপদান করেন তিনি যদি নিমেষের অর্ধেক সময়েরও অর্থ্যাৎ চোখের পলক ফেলতে যতটুকু সময় লাগে, সেই সময়ের অর্ধেক সময়ের জন্য যদি তিনি দীপদান করেন, তবে তাঁর সহস্র কোটি কল্পের পাপ বিদূরিত হয়ে যায়।” ─── স্কন্দপুরাণ
✸“কেউ যদি ভগবানকে নিবেদনকৃত প্রসাদী প্রদীপ তাঁর পূর্বপুরুষের উদ্যেশ্য দান করেন, তাহলে সেই পূর্বপুরুষেরা পবিত্রতা এবং শান্তি লাভ করেন।” ─── পদ্মপুরাণ
✸ এই মাসে দীপ দান করলে সর্ব যজ্ঞের এবং সর্ব তীর্থের ফল লাভ হয়।
✸ প্রজ্বলিত কর্পূর দিয়ে দীপদানের মাধ্যমে আরতি করলে সপ্তকল্প যাবৎ ভগবদ্ধামে বাস হয়।
✸ শ্রীহরির সম্মুখে দীপ দান করলে কাম-ক্রোধ ভস্মীভূত হয় এবং পুনর্জন্ম হয় না।
✸ দীপের আলোতে ভগবানের মুখমন্ডল দর্শন করলে ব্রহ্মাহত্যাদি পাপ হতে মুক্ত হওয়া যায়।
✸ যে গৃহে দীপদান করা হয় তাঁর সর্বদা ধন, যশ, সুপুত্র লাভ হয় এবং পূর্বপুরুষগণ সন্তুষ্ট হয়।
✸ যে বাড়ীতে সকাল-সন্ধ্যা ধূপ-প্রদীপ দেখানো হয় সেই বাড়ীতে মা লক্ষ্মী অচলা থাকেন।
Post Views: 192








