
_স্বামী সোমেশ্বরানন্দ
প্রথমত, ধরুন কোনো কারণে আপনার মনে দুশ্চিন্তা চলছে। এই অবস্থায় মনে এক বিশেষ ঢেউ (wave) উঠছে যার জন্য আপনার অস্বস্তি হচ্ছে। এখন জপ করার অর্থ আপনি অন্য এক ঢেউ তুলছেন। জোর করে জপ করে গেলে এই নতুন ঢেউটি জোরালো হয়ে উঠে আগের ঢেউকে চেপে দেবে। কারণ দুটি তরঙ্গ এক সাথে থাকতে পারে না। এভাবে দুশ্চিন্তা-ঢেউ দূর হবে। ••এভাবে মন থেকে অন্যান্য নেগেটিভ চিন্তা ও ভাব আপনি ইচ্ছামতো দূর করে মনকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পরেন।
দ্বিতীয়ত, মনে সবসময় কোনো-না-কোনো চিন্তা চলছেই আপনার অজান্তে। আর এই চিন্তা বা ভাবই আপনাকে প্রভাবিত করছে বা চালাচ্ছে। একে তো আপনার অবচেতন মন থেকে পুরনো স্মৃতি/সংস্কার উঠে আসছে, তার উপর বাইরের পরিস্থিতির প্রভাবও কাজ করছে মনের উপরে। ফলে আপনার চেতন মন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনা সবসময়।
কিন্তু সচেতনভাবে জপ করে আপনি নিজেই এক বিশেষ ঢেউ ওঠাচ্ছেন মনে। এটা বাধা দিচ্ছে অবচেতনের চিন্তা ও বাইরের প্রভাবকে। অর্থাৎ আপনি সচেতনভাবে ঐ দুই ঢেউকে চেপে দিয়ে নিজের ঢেউকে কাজ করাচ্ছেন। এভাবে মনকে আপনিই চালাচ্ছেন। আপনি মালিক, মন ভৃত্য।
তৃতীয়ত, জপের মাধ্যমে আপনি অবচেতন মনে শুভ তরঙ্গ পাঠিয়ে দিব্য সংস্কার তৈরি করছেন। কিভাবে?
পতঞ্জলি মুনি বলেছেন, জপের সময় মন্ত্রের অর্থ ভাবতে। যেমন মায়ের অর্থ করুণা, শিবের অর্থ শান্ত ভাব, কৃষ্ণ পালন কর্তা, ইত্যাদি। জপ করার সময় ঐ বিশেষ ভাব ওঠানোয় ঐ তরঙ্গ বা ঢেউ চলে যাচ্ছে মনের অবচেতন স্তরে। বার-বার এভাবে করলে ঐ ভাবটি শক্তিশালী হতে থাকে। এবং আপনার মন দিব্য সংস্কারে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে।
চতুর্থত, মন্ত্রের দুটি ভাগ -- বীজ ও নাম। বারবার জপ করলে ঐ বীজ কোনো বিশেষ চক্রে (মূলাধার ইত্যদি) গিয়ে ক্রমাগত ধাক্কা দিতে থাকে। ফলে চক্র-সংযুক্ত নাড়ীগুলিতে কম্পন (vivration) ওঠে। এভাবে ঐ নাড়ীগুলি বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ঐগুলির মাধ্যমে মনের গতি বা কর্মশক্তি বেড়ে যায়। আপনার মনের শক্তি বাড়ে।
মন যেহেতু কাজ করে নাড়ীগুলির মাধ্যমে সেহেতু ঐগুলি যতো পরিস্কার বা smooth হয়, মন ততবেশি flow করতে পারে ঐ নাড়ীগুলি দিয়ে। মন এভাবে বেশি active হয় বীজ মন্ত্রের উচ্চারণে।
পঞ্চমত, প্রার্থনার ভাব নিয়ে জপ করলে আপনি এগিয়ে যান বিশ্বচেতনার দিকে। জপের মাধ্যমে যে দিব্য ঢেউ তুলছেন সেটা অবচেতন স্তর অতিক্রম করে অতিচেতনের দিকে যায়। একান্ত মনে তীব্র জপ করলে এটা ধ্যানে পরিণত হয়। আর তখন এটি বিশ্বচেতনার দিকে যাওয়ার শক্তি পায়।
রূপকের মাধ্যমে বলতে হয়, বিশ্বচেতনা যেন TV আর ধ্যান-তরঙ্গের মাধ্যমে আপনি যেন remote টিপছেন বিশেষ চ্যানেলের জন্য। TV-তে যেমন সব চ্যানেল আছে, বিশ্বচেতনায় তেমনি সব সম্ভবনা রয়েছে। জপের মাধ্যমে আপনি যে বিশেষ ভাবটি তুলছিলেন, সেই ভাবটি গিয়ে বিশ্বচেতনা থেকে সমধর্মী ভাবের সাথে যুক্ত হয়। এবং যেহেতু ধ্যান অবস্থায় "জাগতিক আমি" মুছে যায় সেহেতু আপনার অহংকার কোনো বাধার সৃষ্টি করে না। অর্থাৎ, মাতৃমন্ত্রের জপে যে করুণার ভাব ওঠাচ্ছিলেন সেটা বিশ্বচেতনার অসীম করুণা সম্ভবনার কাছাকাছি আসে। এভাবে গভীর দিব্যচেতনাকে অনুভব করেন আপনি।
এই পাঁচটির অনুভব যে একই সময়ে হবে আপনার তা নয়। কোনটি হবে তা নির্ভর করে আপনার ইচ্ছা ও সামর্থের উপর।