
লক্ষ্মী পূজোর দিন পূর্ণিমা তিথিকে বলা হয় “কোজাগোরী পূর্ণিমা”। এমন বলা হয় যারা এই দিন রাত্রি জাগরণ করেন – তারা মা লক্ষ্মীর কৃপা প্রাপ্ত করেন । উজ্জয়নীর এক ধর্মপ্রাণ রাজা ছিলেন। তিনি এতটাই প্রজাহিতৈষী ছিলেন যে, তিনি ঘোষোনা করেছিলেন হাটে যে বস্তু বিক্রয় হবে না, তা তিনি কিনবেন। যাতে কোনো দোকানী অভাবী না থাকে। একবার এক দোকানী অলক্ষ্মীর এক মূর্তি আনে। কিন্তু কে আর নিজের গৃহে দুর্ভাগ্য, হতাশা, দারিদ্র, জরা নিয়ে যাবে! তাই সেই মূর্তি কেও নিলো না। রাজা সেই মূর্তি উপযুক্ত দাম দিয়ে রাজবাড়ী নিয়ে এলেন। অলক্ষ্মীর প্রবেশ মাত্রই রাজার প্রাসাদ থেকে রাজ্যলক্ষ্মী বিদায় নিলেন। একে একে ভাগ্যলক্ষ্মী , কুললক্ষ্মী, যশোলক্ষ্মী রাজাকে ছেড়ে বিদায় নিলেন। রাজার গৃহে হতদরিদ্র দশা হতে লাগলো। রাজ্যে মড়ক আরম্ভ হল। রাজার হাতীশালে হাতী, অশ্বশালায় অশ্ব সব হত হতে লাগলো। এমনকি ফসল ফলন হল না। প্রজারা সেই রাজ্য ছেড়ে পলায়ন করতে লাগলো।
রাজাকে কিন্তু ধর্মরাজ ত্যাগ করেন নি। একদিন ধর্মরাজ রাজাকে ত্যাগ করে যেতে চাইলেন। রাজাকে স্বপ্নে সে সব জানালেন। রাজা এর কারন জানতে চাইলেন। ধর্মরাজ জানালেন অলক্ষ্মীর মূর্তি গৃহে রাখার জন্যই এই সকল সর্বনাশ হয়েছে। রাজার রাজ্যে অলক্ষ্মী দেবী স্থান নিয়েছেন। রাজা বিষন্ন হলেন। ধর্মরাজ রাজাকে স্বপ্নাদেশ দিলেন যে , রানী যেনো আশ্বিনী পূর্ণিমায় কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা করেন। তাহলেই মা লক্ষ্মী আবার ফিরে আসবেন। রাজার ধর্মশীলা পত্নী সেই মতো কোজাগরী পূর্ণিমাতে মা লক্ষ্মীর পূজা করে চিঁড়ে, ডাবের জল, নারকেল প্রসাদ গ্রহণ করে সারারাত অতিবাহিত করেন। মা লক্ষ্মী কৃপা করলেন। সেইক্ষনেই অলক্ষ্মী দেবী সেই রাজ্য ছেড়ে চলে যান। দেবী লক্ষ্মীর কৃপায় সুখ- সম্পদ- ঐশ্বর্য- ফসল সেই রাজ্যে উপচে পড়ে।
এইভাবে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার কথা দিকে দিকে প্রচারিত হয়।
মা লক্ষ্মী কখনো সম্পদ ঐশ্বর্য রূপে আবার কখনো মানবের মধ্যে “শ্রী” অর্থাৎ সুচরিত্র রূপে, মেঘের বৃষ্টিফোঁটায়- যার বর্ষণে ধরাধামে খাদ্যশস্য উৎপন্ন হয়, আবার খাদ্যশস্য রূপে যা মানবের অন্নের যোগান ঘটায় , রত্ন সম্পদ – পশুসম্পদ রূপে , যজ্ঞান্তে পুরোহিতের দক্ষিণা রূপে সর্বত্র বিরাজিতা। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে লেখা হয়েছে-
স্বর্গে চ স্বর্গলক্ষ্মীশ্চ সম্পৎস্বরূপিণী ।
পাতালেষু চ মর্ত্ত্যেষু রাজলক্ষ্মীশ্চ রাজসু ।।
গৃহলক্ষ্মীর্গৃহেম্বেব গৃহিণী চ কলাংশয়া ।
সম্পৎস্বরূপা গৃহিণাং সর্ব্বমঙ্গলমঙ্গলা ।।
গবাং প্রসূঃ সা সুরভী দক্ষিণা যজ্ঞকামিনী ।
ক্ষীরোদসিন্ধুকন্যা সা শ্রীরূপা পদ্মিনীষু চ ।।
শোভারূপা চ চন্দ্রে চ সূর্য্যমণ্ডলমণ্ডিতা ।
বিভূষণেষু রত্নেষু ফলেষু চ জলেষু চ ।।
নৃপেষু নৃপপত্নীষু দিব্যস্ত্রীষু গৃহেষু চ ।
সর্ব্বশস্যেষু বস্ত্রেষু স্থানেষু সংস্কৃতেষু চ ।।
প্রতিমাষু চ দেবানাং মঙ্গলেষু ঘটেষু চ ।
বৃক্ষশাখাসু রম্যাসু নবমেঘেষু বস্তুষু ।।
( ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণ… প্রকৃতিখণ্ড… পঞ্চত্রিংশোহধ্যায়… ১৮-২৪ )
অর্থাৎ- সেই দেবী ইন্দ্রের সম্পদরূপে স্বর্গলক্ষ্মী রূপে, পাতালে ও ভূলোকে নৃপতির গৃহে রাজলক্ষ্মী রূপে বিরাজিতা। সেই সর্বমঙ্গল- মঙ্গলা দেবীই গৃহীগণের গৃহে গৃহলক্ষ্মীরূপে , কলাংশ দ্বারা গৃহিনী রূপে বিরাজিতা । সেই দেবী গোগণের প্রসূতি সুরভি রূপে- যজ্ঞকামিনী দক্ষিণারূপে – ক্ষীরোদসাগরের দুহিতা রূপে বিরাজ করেন। পদ্মনীতে শ্রীরূপে এবং চন্দ্র ও সূর্যমণ্ডলের জ্যোতিরূপে – রত্নে- ফলে- জলে- নৃপ ও নৃপপত্নীর মধ্যে , দিব্য স্ত্রীতে , গৃহে, সমস্ত শস্যকনায় বিরাজ করেন। সেই কমলা দেবী পরিষ্কার স্থানে, দেবপ্রতিমায়, মঙ্গলঘটে, মাণিক্যে , মুক্তার মালায় , মণি- হীরকে , চন্দনে, রমণীয় বৃক্ষশাখায় ও নতুন মেঘে শোভারূপে বিরাজ করেন।
দেবী স্বয়ং সকল প্রকার সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী । আবার ধান- গম- ভূট্টা – সরিসা- ইত্যাদি সমস্ত শস্যতে তিঁনিই বিরাজ করেন । তাই খাদ্যদ্রব্য নষ্ট করা অনুচিত। মা লক্ষ্মীর ছবিতে দেখবেন চতুর্ভুজা লক্ষ্মীদেবীর সাথে কলস ভর্তি মোহোর ও নানা স্বর্ণআভূষণ ভর্তি কলস থাকে। আর দ্বিভুজা লক্ষ্মী দেবীর ছবিতে গ্রাম্য পরিবেশ ও ধানের ক্ষেত থাকে। ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণেই লেখা-
সম্পত্তাধিষ্ঠাতৃদেব্যৈ মহাদেব্যৈ নমো নমঃ ।
শস্যাধিষ্ঠাতৃদেব্যৈ চ শস্যায়ৈ চ নমো নমঃ ।।
(ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ/ একোনচত্বারিংশোহধ্যায়ঃ/ ৫৬ )
অর্থাৎ- হে সকল সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, আপনাকে প্রণাম করি। হে শস্যাধিষ্ঠাত্রী দেবী ! হে শস্যস্বরূপা দেবী আপনাকে প্রণাম করি।
গৃহে গৃহে গৃহবধূরাই গৃহলক্ষ্মী। মা লক্ষ্মী সেই সদাচারশীলা রমণীতেই আবির্ভূতা হয়ে গৃহে মঙ্গল ও উন্নতি সম্পাদন করেন। আবার স্বর্গে তিঁনিই স্বর্গলক্ষ্মী। দেবতাদের বৈভবের কারণ তিঁনি। উক্ত পুরাণেই লেখা-
স্বর্গলক্ষ্মীরিন্দ্রগেহে রাজলক্ষ্মীর্নৃপালয়ে ।
গৃহলক্ষ্মীশ্চ গৃহিণাং গেহে চ গৃহদেবতা ।।
(ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ/ একোনচত্বারিংশোহধ্যায়ঃ/ ৫৯ )
অর্থাৎ- তিঁনিই স্বর্গে স্বর্গলক্ষ্মী, রাজার আলয়ে রাজলক্ষ্মী আর গৃহের মধ্যে গৃহলক্ষ্মী ও গৃহদেবতা রূপে বিরাজ করেন ।
লক্ষ্মীর পাঁচালীতে আমরা অনেক জেনেছি উচ্চবাক্য, ক্রোধ, হিংসা, ঝগড়া- মারামারি যেখানে হয় মা লক্ষ্মী সেখান থেকে বিদায় নেন। কারণ মা লক্ষ্মী এগুলো পছন্দ করেন না।
ক্রোধহিংসাবর্জ্জিতা চ বরদা চ শুভাননা ।
পরমার্থপ্রদা ত্বঞ্চ হরিদাস্যপ্রদা পরা ।।
(ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ/ একোনচত্বারিংশোহধ্যায়ঃ/ ৬২)
অর্থাৎ- হে বরদে ! হে শুভদে ! আপনার মধ্যে ক্রোধ- হিংসা কখনোই থাকতে পারে না। হে পরমার্থদায়িনী দেবী আপনি হরিরসেবা করার অধিকার প্রদান করেন।
উক্ত পুরাণেই লেখা যে ভক্ত মায়ের পূজো করেন , তিঁনি পরমার্থ লাভ করেন। তাঁর সংসারের উন্নতি হয় ও মঙ্গল হয় ।








