আমি অনেকবারই বলি যে নির্দিষ্ট তিথিতে তিথিরাজ দেবতা বা দেবীশক্তি সক্রিয় থাকেন - খুব সহজেই তিনি ভক্তের পূজায় সাড়া দেন, তিনি জেগে ওঠেন।
গতকাল আমার একটি ছাত্রীর কাছে শুনলাম একটি আশ্চর্য ঘটনা। সে দীর্ঘদিন স্কটল্যান্ডে আছে এবং গত কয়েকবছর ধরে সেখানকার দুর্গাপূজায় তন্ত্রধারক হচ্ছে। পূজারী ওখানকারই এক বড় ডাক্তার। পূজারী এবং তন্ত্রধারক দুজনেই বেলুড়মঠে এসে পূজাবিধি ভালভাবে শিখে গেছে, তাই পূজায় কোন ত্রুটি হয় না। নবমীতে একটি অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছে ওদের পূজা-অনুষ্ঠানে।
ঘটনাটি বলার আগে পূজা সম্বন্ধে দু – চার কথা বলে নিই।
বৈধী পূজা প্রসঙ্গে বলা হয়,
অর্চকস্য তপোযোগাৎ দ্রব্যস্য চাতিশয়নাৎ।
আভিরূপ্যাচ্চ বিম্বানাং দেবঃ সান্নিধ্যমিচ্ছতি।।
বৈধীপূজায় তিনটি বিষয় একান্ত প্রয়োজনীয়। যিনি পূজা করবেন – তাঁর তপস্যার প্রয়োজন। যদি তিনি নিজের ইন্দ্রিয় এবং মনকে সংযত করতে না পারেন, তাহলে হৃদয়দেবতাকে জাগাবেন কিভাবে? প্রতিমায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন একমাত্র পূজক। তিনি তাঁর নিজের প্রাণশক্তিতে,তাঁর তপস্যার বলে মৃণ্ময়ীকে চিন্ময়ী করেন। নাহলে মন্ত্র উচ্চারণই কেবল হয় আর প্রতিমাকে ঘিরে খাওয়া-দাওয়া, নাচ-গানের আত্মবিলাস হয়।
দ্বিতীয়ত, প্রতিমাটি যেন ভুবনমোহন হয় যা দেখে জগজ্জননীর স্মৃতি আপনিই স্মৃতিপটে জেগে ওঠে।
তৃতীয় হল, পূজাদ্রব্যের আতিশয্য চাই।
এর দুটি অর্থ আছে।
প্রথম, গৃহস্থের বিত্তশাঠ্য না থাকে। বাড়িকে আলোয় আলোময় করা হল, বন্ধুবান্ধবদের জন্য বিরাট আয়োজন হল, বহু অর্থব্যয়ে দেবীর চোখ ধাঁধাঁনো প্রতিমা হল – কিন্তু পূজার উপকরণে যত দৈন্য! মাকে উপহার দেওয়া হচ্ছে সবচেয়ে কমদামী দানসামগ্রী! কারণ দেবী তো কিছু দেখেন না, মাটির প্রতিমা যে!!! তাই তাকে যা খুশী দেওয়া যায়, তার সাথে যে কোন অনাচার করা যায় - ।
‘দ্রব্যস্য চাতিশয়নাৎ’ – শব্দের দ্বিতীয় অর্থটি হল, পূজাদ্রব্য যেন শিল্পসম্মত হয়। কারণ সুন্দর, রুচিশীল পূজাসামগ্রী ভাবভক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।
এই তিনটি একত্রিত হলে সেই পূজায় দেবী জেগে ওঠেন।
আমার ছাত্রীর করা পূজার কথা বলছিলাম।
নবমী পূজা চলাকালীন দেরী হয়ে যাচ্ছে বলে তন্ত্রধারক এবং পূজার পূজার আসনেই তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেয় যে ভৈরবের পূজা তারা পঞ্চোপচারে করবে। বেলুড়মঠের পূজাবিধিতে লেখা আছে যে ভৈরবের পূজা পঞ্চোপচার (গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য) বা দশোপচারে (পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমনীয়, স্নানীয়, গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য, পুনরাচমনীয়) করা যাবে। ওরা ঠিক করে ছোট করেই পূজা করে নেবে, কারণ সময় নেই। সেইমত পূজা শেষ হয়ে গেল। একথা জানে কেবল পুজারী এবং তন্ত্রধারক।
দশমীর সকালে ছাত্রীটির বন্ধু হঠাৎ তাকে ফোন করে। সেই অবাঙালি মেয়েটিও সকলের সাথে দুর্গাপূজায় অংশগ্রহণ করেছিল। আতঙ্কিত বন্ধুটি জানায় যে গতরাতে সে একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে। এক ভয়ঙ্কর পুরুষ মূর্তি তাকে বলছে বার বার – ‘আমি খুব অসন্তুষ্ট হয়েছি’। আমার ছাত্রীর মনে পড়ে যায় নবমীতে ভৈরবের পূজার কথা। সে পূজারীর সাথে সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করে। স্বপ্নে দেখা সেই বিশাল মূর্তির বর্ণনা শুনে ওরা দুজনেই বুঝতে পারে যে মেয়েটি কালভৈরবকে দর্শন করেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হল, কেউই তো জানতো না যে পূজায় এমন সংক্ষেপকরণ হয়েছে!
বিজয়া দশমীতে ভৈরবের তুষ্টির জন্য তাঁর দশোপচার পূজা করা হল ।
এভাবেই দেবী জাগেন, দেবী পূজা নেন, দেবী ভুল ধরিয়ে দেন, বুঝিয়ে দেন যে তিনি উপস্থিত হয়েছেন।
অনেকেই বাড়িতে লক্ষ্মীপূজা ইত্যাদি করে থাকেন। যদি বৈধী পূজা করেন, তাহলে ওপরের তিনটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখলে ভাল।
মনে হতে পারে যে পুরোহি্তের তপস্যা তো আমাদের হাতে নেই। পুরোহিত যদি ভালভাবে পূজা না করেন তাহলে আমরা কি করবো। তোমার নিজের তপস্যা তো তোমার হাতে আছে। তুমি পূজার মন্ত্রগুলি আগে পড়ে নাও, বুঝে নাও। তুমি পাশে বসে মনে মনে অর্থ বুঝে মন্ত্রোচ্চারণ কর ধীর গলায় - আর তার সাথে হৃদয় নিঙড়ানো ভক্তি মিশিয়ে দাও। মা ঠিক জেগে উঠবেন।
যারা বাড়িতে পূজা করে তারা নিশ্চয়ই মনে রাখে যে পূজায় গুরুত্ব পাবেন একমাত্র দেবতা। তিনি আসছেন, তিনি এসেছেন। তাঁর আপ্যায়ন ছাড়া বাকি সব গৌণ!
প্রব্রাজিকা বেদরূপপ্রাণা।।