
মন্ত্র জপ করার তিন প্রকার নিয়ম আছে — বাচিক, উপাংশ ও মানস। বাচিক জপ সর্বনিম্ন এবং মানস জপ সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। যে জপ এত উচ্চস্বরে করা হয় যে, সকলে শুনতে পায়, তাকে ‘বাচিক’ বলে। যে জপে কেবল ওষ্ঠে স্পন্দনমাত্র হয়, কিন্তু কোন শব্দ শোনা যায় না, তাকে ‘উপাংশ’ বলে। যে মন্ত্রজপে কোন শব্দ শোনা যায় না, জপ করার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রের অর্থ স্মরণ করা হয়, তাকে ‘মানস জপ’ বলে। মানস জপই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।
🕉🔱🕉 ঋষিগণ বলেছেন, শৌচ দ্বিবিধ — বাহ্য ও আভ্যন্তর। মৃত্তিকা, জল অথবা অন্যান্য দ্রব্য দ্বারা শরীরের শুদ্ধিকে ‘বাহ্য শৌচ’ বলে; যথা স্নানাদি। সত্য ও অন্যান্য ধর্মানুশীলন দ্বারা মনের শুদ্ধিকে ‘আভ্যন্তর শৌচ’ বলে। বাহ্য ও আভ্যন্তর-উভয় শুদ্ধিই আবশ্যক। কেবল ভিতরে শুচি থেকে বাইরে অশুচি থাকলে শৌচ যথেষ্ট হ’ল না। যখন উভয় প্রকার শুদ্ধি কার্যে পরিণত করা সম্ভব না হয়, তখন কেবল আভ্যন্তর শৌচ-অবলম্বনই শ্রেয়স্কর। কিন্তু এই উভয় প্রকার শৌচ না থাকলে কেউই জপের উপযোগী হ’তে পারেন না।
🕉🔱🕉 আসন সম্বন্ধে এটুকু বুঝতে হবে যে, বুক, গলা, মাথা, মেরুদণ্ড সমান রেখে শরীরটিকে বেশ স্বচ্ছন্দভাবে রাখতে হ’বে। তারপর প্রাণায়াম। ‘প্রাণ’ শব্দের অর্থ-নিজ শরীরের ভিতরের জীবনীশক্তি, এবং ‘আয়াম’ শব্দের অর্থ -প্রাণের সংযম বা নিয়ন্ত্রণ। প্রাণায়াম তিন প্রকার — অধম, মধ্যম ও উত্তম। প্রাণায়াম তিন ভাগে বিভক্ত — পূরক, কুম্ভক ও রেচক। যে প্রাণায়ামে ১২ সেকেন্ড কাল বায়ু পূরণ করা যায়, তাকে ‘অধম প্রাণায়াম’ বলে। ২৪ সেকেন্ড কাল বায়ু পূরণ করলে ‘মধ্যম প্রাণায়াম’ ও ৩৬ সেকেন্ড কাল বায়ু পূরণ করলে তাহাকে ‘উত্তম প্রাণায়াম’ বলে। অধম প্রাণায়ামে ঘাম ও মধ্যম প্রাণায়ামে কম্পন হয়; উত্তম প্রাণায়ামে শরীর লঘু হয় এবং ভিতরে পরম আনন্দ অনুভূত হয়। প্রাণায়াম বিনা জপ ফলদায়ী হতে অধিক সময় লাগে।
🕉🔱🕉 জপকর্মের সময় কল্পনা করতে হবে, মাথা থেকে কিঞ্চিং উপরে একটা পদ্ম রয়েছে, ধর্ম তার কেন্দ্র, জ্ঞান তার মৃণাল, সাধকের অষ্টসিদ্ধি ঐ পদ্মের অষ্টদল, আর বৈরাগ্য তারর ভিতরের কর্ণিকা। যদি সাধক বাইরের শক্তি (অষ্টসিদ্ধি) পরিত্যাগ করতে পারে, তবেই সে মুক্তিলাভ করবে। এই কারণেই অষ্টসিদ্ধিকে বাইরের অষ্টদলরুপে এবং ভিতরের কর্ণিকাকে পর-বৈরাগ্য অর্থাৎ অষ্টসিদ্ধিতেও ‘বৈরাগ্য’-রূপে বর্ণনা করা হ’ল। এই পদ্মের অভ্যন্তরস্থ কর্ণিকাকে পর-বৈরাগ্য অর্থাৎ অষ্টসিদ্ধিতেও ‘বৈরাগ্য’-রূপে বর্ণনা করা হইল। এই পদ্মের ভিতরে হিরন্ময়, সর্বশক্তিমান্, অস্পর্শ্য, ওঙ্কারবাচ্য, অব্যক্ত, জ্যোতির্মন্ডলমধ্যবর্তী ইষ্ট ধ্যান করতে করতে জপ করতে হয়।
🕉🔱🕉 আর একপ্রকার জপের বিষয় হল — চিন্তা করতে হবে, জপকর্রমীর হৃদয়ের ভিতরে একটি আকাশ রয়েছে, আর ঐ আকাশের মধ্যে একটি অগ্নিশিখা জ্বলছে; ঐ শিখাকে নিজ আত্মারূপে চিন্তা করে ঐ শিখার অভ্যন্তরে আর এক জ্যোতির্ময় আলোকের চিন্তা করতে হবে। এই হল সাধকের আত্মার আত্মা –পরমাত্মা, ঈশ্বর। হৃদয়ে এই ভাবটি ধ্যান করেই জপকর্ম এগোন ভাল। ব্রহ্মচর্য, অহিংসা, সত্য, আস্তিক্য ইত্যাদি বিভিন্ন বৃত্তি সিদ্ধ না হলেও, দুঃখিত বা ভীত না হয়ে ঐ সব বৃত্তির অনুকুল কর্ম চেষ্টা করা উচিৎ, ধীরে ধীরে সবই আসবে। বিষয়াসক্তি, ভয় ও ক্রোধ পরিত্যাগ করে, নিজ গুরুদেবের দেখানো পথে যিনি ভগবানে তন্ময় হয়েছেন, জপকর্মে নিরত হয়ে তাঁরই শরণাগত হয়েছেন, যাঁর হৃদয় পবিত্র হয়েছে, তিনি ভগবানের কাছে যা কিছু আশা করেন, ভগবান্ তৎক্ষণাৎ তা পূরণ করে দেন।








