
মনুষ্যত্বের লাভের দ্বিতীয় পরীক্ষা হল শীল” – এর বাস্তবায়ন। শীল কথার অর্থ আচরণ।সুশীল, পরিশীলন– এইশব্দগুলির মধ্যে এর তাৎপর্য নিহিত আছে।সহজ কথায় এর অপর নাম ব্যবহার। আত্মত্রাণের জন্য আমাদের নিজ নিজ প্রতিদিনের জীবনে ব্যবহার বা আচরণকে ঠিক করতে হবে।এজন্য আমাদের প্রতিনিয়ত সদাচারী হবার চেষ্টা করতে হবে।আমরা অপরের সাথে কেমন ব্যবহার করছি সেটি দেখে বুঝা যাবে,আমরা কতটা মানুষ হতে পেরেছি।কোথাও যাবার জন্য পথে বাসযাত্রা করলে তার ভেতরে অনেক সময় লেখা দেখতে পাওয়া যায়—- আপনার ব্যবহারই আপনার পরিচয়। একটি অনবদ্য সুভাষিতে বলা হয়েছেঃ
আচারঃ পরমো ধর্ম আচারঃ পরমং তপঃ।
আচারঃ পরমং জ্ঞানম্ আচারাৎ কিং ন সাধ্যতে।।
সদাচারেণ সর্বেষাং শুদ্ধং ভবতি মানসম্।
নির্মলং চ বিশুদ্ধং চ মানসং দেবমন্দিরম্।
আচারই পরম ধর্ম, আচারই পরম তপস্যা,আচারই পরম জ্ঞান আর আচার দিয়ে সাধ্য নয়,এমন কিছু জগতে নেই।সদাচার দিয়ে মন শুদ্ধ হয়।আর মন বিশুদ্ধ ও নির্মল হলে তা দেবমন্দির হয়ে যায়।বস্তুত আমরা মনুষ্য শরীরধারী প্রতিটি ব্যাক্তি দেবমন্দিরতূল্য। কী অপূর্ব এই ভাবনা।মানুষের মহিমা প্রকাশের জন্য এর চেয়ে বড় কথা আর কী হতে পারে? স্বামীজী মনুষ্য শরীরকে তাজমহল মন্দির বলে উল্লেখ করেছেন। আমাদের বিদ্যা,বুদ্ধি, বল ইত্যাদি অনেক গুরুত্বপূর্ণ গুণের ঘাটতি থাকলেও শুধু যদি সদাচার থাকে,তাহলে সব ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়।একটি ইংরেজী সুন্দর কথায় বলা হয়েছে– It is nice to be important– but it is more important to be nice. এর অর্থ গুরুত্বপূর্ণব্যাক্তি হওয়া ভাল কিন্ত ভাল হওয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্য একটি কথাতেও অনুরূপভাবে বলা হয়েছে– Goodness is greater than greatness. অর্থাৎ ভাল হওয়া বড় হওয়ার চেয়েও অনেক বড় জিনিস। নিচের সুভাষিতটির বলা হয়েছে যদি কেউ জীবনে প্রতিষ্ঠালাভ করতে চায় তাহলে সেই গুণবান ব্যাক্তিকে শীলবান অর্থাৎ সদাচারী হতে হবেঃ
কুলীনতা সদারাধ্য সুপ্রতিষ্ঠাং যদীচ্ছসি।
আত্মবৈভবলাভার্থম্ গুণবান্ শীলবান্ ভব।।
অর্থাৎঃ– বলা হয়েছে জগতে দানের তূল্য অন্য দ্বিতীয় সুহূদ কেউ নেই,লোভের ন্যায় অন্য দ্বিতীয় শক্র কেউ নেই,সদাচারের মতন এমন অলংকার নেই এবং সন্তোষের তূল্য ধন নেই।
দানেন তূল্যং সুহৃদস্তি নান্যো
লোভাচ্চ নান্যোহস্তি রিপুঃ পৃথিব্যাম্।
বিভুষণং শীলসমং ন চান্যৎ
সন্তোষতুল্যং ধনমস্তি নান্যো।।
নীচের শ্লোকটিতে বলা হয়েছে জগতে যিনি যেমন স্বভাবের মানুষ, তিনি তেমন প্রকৃতির মানুষের সঙ্গেই মেলামেশা করেন।যেমন পশুদের মধ্যে হরিণ অন্য হরিণের সঙ্গে মেশে, গরু গরুর সঙ্গে মেলামেশা করে, ঘোড়া ঘোড়ার সঙ্গ ভালবাসে,মূর্খেরা মূর্খদের সাহচর্য ভালবাসে আর সুধীজন সুধীজনের সঙ্গই করে থাকেনঃ–
মৃগা মৃগৈঃ সংগমুপব্রজন্তি গাবশ্চ গোভিস্তরগাস্তংগৈঃ।
মূর্খাশ্চ মূর্খৈঃ সুধয়ঃ সুধীভিঃ সমানশীলব্যসনেষু সখ্যম্।।
আর সদাচার কোনগুলি বলতে গিয়ে বলা হয়েছেঃ-
অনসূয়া ক্ষমা শান্তি সন্তোষ প্রিয়বাদিতা।
কাম-ক্রোধ- পরিত্যাগঃ শিষ্টাচার- নিদর্শনম্। ।
অর্থাৎঃ- ঈর্ষাহীনতা,ক্ষমা, শান্তি,সন্তোষ,মধুরভাষন ও কামক্রোধ ত্যাগই হল প্রকৃত শিষ্টাচার। এই শিষ্টাচারে প্রতিষ্ঠালাভ ও মানুষ হওয়া এক কথা।তবে এগুলির ব্যাখ্যার পূর্বে আমরা ‘গুণেন’ ও কর্মণা’ বিষয়ে আলোচনায় আসার চেষ্টা করব।








