স্বামী_সোমেশ্বরানন্দ
ভ্রু-মধ্য ইচ্ছাশক্তির স্থান, আর হৃদয় হল ভাবের (feelings)। ভ্রূ-মধ্যে মনকে একাগ্র করলে ইচ্ছাশক্তি (will power) বাড়ে। আর হৃদয়ে বাড়ে সংবেদনশীলতা (sensitivity)। সাধারণত যোগ ও জ্ঞান পথে ভ্রূমধ্য (আজ্ঞা চক্র) এবং ভক্তিপথে হৃদয়ে (অনাহত চক্র) ধ্যান করার কথা বলা হয়।
আপনি চিন্তা করবেন না। যে-কোন স্থানে ধ্যান করলেই হবে। তবে গুরুর নির্দেশ পালন করলেই ভাল কারণ তিনি যে-সাধনপদ্ধতি শিখিয়েছেন, সেই পদ্ধতিতে ঐ বিশেষ স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ ধ্যানের জন্য।
তাছাড়া হৃদয় খুব নিরাপদ স্থান ধ্যানের জন্য। ভ্রূ-মধ্যে ধ্যান করলে অনেকের মাথা ধরে।
অনুভব করেছেন নিশ্চয় যে ভ্রূ-মধ্যে মনকে একাগ্র করলে শক্তি যেন বাইরের দিকে যাচ্ছে, মনে হয়। কিন্তু হৃদয়ে একাগ্র করলে সেটা হয় না, বরং ভাব বা আবেগ ওঠে।
তবে আপনি যদি মঠের দীক্ষিত হন, গুরুর নির্দেশমতো হৃদয়েই ধ্যান করুন। সাধনার গভীরে ঢুকে অনুভব করবেন যে মন নিজেই ভ্রূ-মধ্যে উঠে গেছে। পরে আবার হৃদয়ে আসবে। এভাবে দুটি চক্রের সুফলই পাবেন।
যারা শুধু ভ্রূ-মধ্যে ধ্যান করেন, তারা প্রবল ইচ্ছাশক্তির অধিকারী হন ঠিকই কিন্তু অনেকেই কঠোর স্বভাবের হয়ে যান। অন্যদিকে হৃদয়ের ধ্যানে অনেকে আবেগী (emotional) হয়ে পড়েন। কিন্তু আন্তরিকভাবে সাধনা করে গেলে এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য (balance) আসে।
অর্থাৎ দুইয়েরই ভাল-মন্দ দিক আছে। সাধকের স্বভাব অনুযায়ী এক-একজনের ক্ষেত্রে এক-এক রকম অনুভব হয়।
সাধনার সময় পরীক্ষা করে দেখেছি, আরেকটা পদ্ধতি আছে ধ্যানে। আমি প্রথম থেকেই ভ্রূ-মধ্যে ধ্যান করতাম। ভাল লাগত, কোনো অসুবিধা হত না।
দেখলাম, ভ্রূ-মধ্যে মনকে একাগ্র করলে শক্তি যেন সামনে যেতে চায়। কিন্তু একাগ্র না করে শুধু নিজের চেতনাকে অনুভব করলে শক্তি সামনে না গিয়ে ভেতরে ঢুকতে থাকে। আমি-ভাবের (I-awareness) উপর মন রাখলে, কিংবা "আমি কি (বা কে)?" অনুসন্ধান করলে অন্যরকম অনুভব হয়। সব চিন্তা ও ভাব থেমে গিয়ে মনের গভীরে অন্য এক সত্তার অনুভব হয়।
ভ্রূ-মধ্যে ধ্যান করলে নানা সূক্ষ্ম শক্তির প্রকাশ হয় যা এতদিন সুপ্ত ছিল। কিন্তু এর বিপদ হল, এই শক্তি দেখিয়ে অন্যদের প্রভাবিত করার বাসনা জাগতে পারে। এই ইচ্ছা বাঁধা হয়ে ওঠে সাধনায়। এজন্য ভ্রূ-মধ্যের ধ্যানে আত্মবিচার বেশি উপযোগী বলে আমার মনে হয়েছে।
তবে আমার কথা শুনে আপনিও এ করতে যাবেন না। ধ্যানের গভীরে গেলে নিজেই বুঝতে পারবেন কি করতে হবে।
বর্তমানে গুরু-নির্দেশ অনুযায়ী সাধনা করে যান। এটা নিরাপদ পথ।