শীতের মিঠে রোদে পিঠে-পুলি খাওয়ার আনন্দ মানেই মকর সংক্রান্তি (Makar Sankranti)। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই দিনটির গুরুত্ব শুধু বাঙালির ভুরিভোজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়? এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক মহাজাগতিক ঘটনা এবং হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস। পৌষের শেষে কেন পালন করা হয় এই উৎসব? চলুন জেনে নিই, মকর সংক্রান্তির আসল রহস্য।
সূর্যের ঘর বদল মকর সংক্রান্তি (Makar Sankranti) আসলে একটি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল বা মহাজাগতিক ঘটনা। এই দিনটিতে সূর্য ধনু রাশি (Sagittarius) থেকে মকর রাশিতে (Capricorn) প্রবেশ করে। এই ‘সংক্রান্তি’ শব্দটির অর্থই হলো ‘সঞ্চালন’ বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন।
বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘উত্তরায়ণ’। অর্থাৎ, এই দিন থেকেই সূর্য তার দক্ষিণদিকের যাত্রা শেষ করে উত্তর দিকে সরতে শুরু করে। প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বাস করা হয়, উত্তরায়ণের এই সময়টি দেবতাদের দিন এবং দক্ষিণায়ন হলো দেবতাদের রাত্রি। তাই এই সময়টিকে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। এই দিন থেকেই দিন বড় হতে শুরু করে এবং রাতের দৈর্ঘ্য কমতে থাকে।
মকর সংক্রান্তির (Makar Sankranti) সঙ্গে জড়িয়ে আছে মহাভারতের এক অদ্ভুত ঘটনা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শরশয্যায় শুয়ে থেকেও পিতামহ ভীষ্ম প্রাণ ত্যাগ করেননি। তিনি অপেক্ষা করেছিলেন সূর্যের উত্তরায়ণের জন্য। ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যুর বর ছিল। তিনি জানতেন, দক্ষিণায়নে মৃত্যু হলে আত্মাকে পুনরায় জন্ম নিতে হয়, কিন্তু উত্তরায়ণে মৃত্যু হলে মোক্ষ লাভ হয়। তাই অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেও তিনি এই বিশেষ দিনটির জন্যই অপেক্ষা করেছিলেন। মকর সংক্রান্তির দিন সূর্য উত্তরায়ণে প্রবেশ করলেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মকর সংক্রান্তির (Makar Sankranti) দিনে গঙ্গাসাগরে স্নান করার প্রথা বহু পুরনো। কিন্তু কেন? পুরাণে বলা হয়, ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা ভগীরথ কঠোর তপস্যা করে মা গঙ্গাকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর পূর্বপুরুষদের অভিশাপ মুক্ত করার জন্য গঙ্গা মর্ত্যে প্রবাহিত হয়ে কপিল মুনির আশ্রমের পাশ দিয়ে গিয়ে সাগরে মিলিত হন। সেই তিথিটি ছিল মকর সংক্রান্তি। তাই বিশ্বাস করা হয়, এই দিন গঙ্গাসাগরে স্নান করলে সমস্ত পাপ ধুয়ে যায় এবং পূর্বপুরুষরা মোক্ষ লাভ করেন। এই কারণেই বলা হয়, “সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর একবার।”
মকর সংক্রান্তিতে (Makar Sankranti) তিল ও গুড় খাওয়ার প্রথা ভারতজুড়েই প্রচলিত। মহারাষ্ট্রে বলা হয়, “তিল-গুল ঘ্যা, আর গোড় গোড় বোলা।” কিন্তু এর পেছনেও রয়েছে স্বাস্থ্যকর কারণ। মকর সংক্রান্তি আসে শীতের চূড়ান্ত সময়ে। আয়ুর্বেদ মতে, তিল এবং গুড়—উভয়ই শরীরকে ভেতর থেকে গরম রাখতে সাহায্য করে (Heat generating food)। এই সময়ে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা কমে যায়, আর তিলের তেল ও গুড়ের পুষ্টিগুণ শরীরকে চনমনে রাখতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, এটি কেবল প্রথা নয়, বরং ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি বিজ্ঞানসম্মত ডায়েট।
ভারতবর্ষের বৈচিত্র্য এই একটি উৎসবেই সবথেকে ভালো বোঝা যায়। আমাদের বঙ্গে যা ‘মকর সংক্রান্তি’ (Makar Sankranti) বা ‘পৌষ সংক্রান্তি’, আসামে তাই ‘ভোগালি বিহু’। তামিলনাড়ুতে এই উৎসব পালিত হয় ‘পোঙ্গল’ হিসেবে, যেখানে নতুন চালের পায়েস রান্না করে সূর্যদেবকে নিবেদন করা হয়। আবার পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় এই সময়ের উৎসব হলো ‘লোহরি’। নাম আলাদা হলেও, মূল সুর কিন্তু একই—নতুন ফসল ঘরে তোলা এবং সূর্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো।
মকর সংক্রান্তি তাই কেবল পিঠে খাওয়ার দিন নয়, এটি প্রকৃতি, বিজ্ঞান এবং বিশ্বাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। সূর্যের অবস্থান পরিবর্তন যেমন আমাদের ঋতুচক্রে বদল আনে, তেমনই এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় অন্ধকারের শেষে আলোর যাত্রাপথের কথা। তাই এবারের সংক্রান্তিতে শুধু মিষ্টিমুখ নয়, এই দিনটির গভীর তাৎপর্যও উপভোগ করুন।