প্রণাম

প্রণাম কাকে বলে? প্রণাম কত প্রকার? শাস্ত্র অনুযায়ী প্রণাম বিধি
প্রণাম অর্থ—শরীর, বাক্য ও মন দ্বারা পূর্ণ আত্মসমর্পণপূর্বক দেবতা, গুরু বা শ্রদ্ধেয় সত্তার নিকট নম্রতা নিবেদন।
শাস্ত্র অনুযায়ী প্রণাম চার প্রকার—
১) সাষ্টাঙ্গ প্রণাম
২) পঞ্চাঙ্গ প্রণাম
৩) কায়িক প্রণাম
৪) বাচিক প্রণাম
🔹 দেবপূজায় সাষ্টাঙ্গ ও পঞ্চাঙ্গ প্রণামই প্রশস্ত।
🔹 পূজান্তে এইরূপ প্রণাম কর্তব্য।
🔹 পূজাকালে আসনোপবিষ্ট পূজক করযোড়ে প্রণাম করবেন।
অষ্টাঙ্গ (সাষ্টাঙ্গ) প্রণাম
শ্লোকঃ
পদ্ভ্যাং করাভ্যাং জানুভ্যামুরসা শিরসা দৃশা।
বচসা মনসা চৈব প্রণামোহষ্টাঙ্গ ঈরিতঃ॥
— তন্ত্রসার
অর্থঃ
পদদ্বয়, হস্তদ্বয়, জানুদ্বয় (হাঁটু), বক্ষ, মস্তক, চক্ষু, বাক্য ও মন—এই অষ্ট অঙ্গ দ্বারা প্রণাম করাকেই অষ্টাঙ্গ বা সাষ্টাঙ্গ প্রণাম বলে।
আরও বলা হয়েছে—
অলিকং নাসিকা বাহু বক্ষো জঠরমেব চ।
পাদৌ ক্ষমাং স্পৃশতো দণ্ডপ্রণামঃ স হি গদ্যতে॥
— মহাকাল সংহিতা
অর্থাৎ—মাথা, নাসিকা, বাহুদ্বয়, বক্ষ, উদর ও পদদ্বয় যখন ভূমি স্পর্শ করে, তখন তাকে দণ্ড প্রণাম বলা হয়।
দণ্ডবৎ (লাঠির মতো সম্পূর্ণ নত হয়ে) পূর্ণ সমর্পণের এই প্রণামই সাষ্টাঙ্গ প্রণাম।
পঞ্চাঙ্গ প্রণাম
শ্লোকঃ
বাহুভ্যাঞ্চৈব জানুভ্যাং শিরসা বচসা দৃশা।
পঞ্চাঙ্গোহয়ং প্রণামঃ স্যাৎ পূজাসু প্রবরাবিমৌ॥
— বৃহৎ তন্ত্রসার
অর্থঃ
বাহুদ্বয়, জানুদ্বয়, মস্তক, বাক্য ও চক্ষু—এই পাঁচ অঙ্গ দ্বারা প্রণাম করাই পঞ্চাঙ্গ প্রণাম।
কালিকা পুরাণ মতে কায়িক প্রণাম
🔹 জানুদ্বয় ও মস্তক দ্বারা ভূমি স্পর্শ করে প্রণাম — উত্তম কায়িক প্রণাম
🔹 কেবল মস্তক দ্বারা ভূমি স্পর্শ — মধ্যম কায়িক প্রণাম
🔹 জানু বা মস্তক স্পর্শ ছাড়া কেবল করযোড়ে মস্তকে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার — অধম প্রণাম
কালিকা পুরাণ মতে বাচিক প্রণাম
🔹 নিজে গদ্য-পদ্য রচনা করে ভক্তিপূর্বক প্রণাম — উত্তম বাচিক প্রণাম
🔹 বৈদিক বা পৌরাণিক মন্ত্রোচ্চারণ — মধ্যম বাচিক প্রণাম
🔹 সাধারণ ভাষাবাক্যে নমস্কার — অধম বাচিক প্রণাম
জরুরি বিধান
🚗 অত্যন্ত ভিড়, ঠেলাঠেলি বা চলন্ত গাড়িতে কেবল করযোড়ে মাথায় বৃদ্ধাঙ্গুলি স্পর্শ করেও প্রণাম গ্রহণযোগ্য;
⚠️ কিন্তু মন্দিরে এসে অবশ্যই সাষ্টাঙ্গ বা পঞ্চাঙ্গ প্রণাম কর্তব্য।
❌ দাঁড়িয়ে কেবল এক আঙুল কপালে ছুঁয়ে প্রণাম নিবেদন করা শাস্ত্রবিরুদ্ধ ও অবৈধ।
কোথায় প্রণাম করা নিষেধ?
❌ ভগবদ্‌ বিগ্রহের একেবারে সম্মুখে সামনাসামনি
❌ বিগ্রহের পিছনে
❌ অতিরিক্ত নিকটে
দেবতা অনুযায়ী প্রণামের দিক
শ্লোকঃ
স্ববামে প্রণমেদ্বিষ্ণু দক্ষিণে শক্তিশঙ্করৌ।
প্রণমেচ্চ গুরুরোগ্রে চান্যথা নিস্ফলং ভবেৎ॥
— পুরোহিত দর্পণ
🔹 বিষ্ণু — নিজের বামে
🔹 শক্তি ও শঙ্কর — নিজের ডানে
🔹 গুরু — নিজের সম্মুখে
অন্যথায় প্রণাম নিষ্ফল।
দেবী প্রণামের বিশেষ বিধি
তন্ত্র মতে দেবীর পট বা বিগ্রহ নিজের ডানদিকে রেখে আসনে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করতে হয়।
❌ খালি মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলে দেবী কুপিত হন।
🔹 কমপক্ষে তিনবার প্রণাম কর্তব্য।
প্রণামের মহিমা (কালিকা পুরাণ)
🔴 নমস্কারে দেবতা, মানুষ, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস প্রীত হন
🔴 নমস্কারেই চতুর্বর্গ লাভ
🔴 নমস্কারে আয়ু বৃদ্ধি ও সর্বসিদ্ধি
দুর্গা দেবীকে প্রণামের ফল
যে নমন্তি নরা দুর্গা শ্রদ্ধয়া পবযাহন্বিতাঃ।
অশ্বমেধফলং প্রাপ্য দুর্গালোকং ব্রজন্তিতে॥
— শাক্তানন্দ তরঙ্গিণী
🔹 সাষ্টাঙ্গ প্রণাম দুর্গা দেবীর অতিশয় প্রিয়।
বিশেষ টীকা
🔸 নারীদের জন্য পঞ্চাঙ্গ প্রণাম বিধেয়
🔸 পুরুষদের জন্য সাষ্টাঙ্গ প্রণাম আবশ্যক
🌺 জয় গুরু | জয় মা 🌺
🙏🙏
# শ্রী জয়গোপাল গোস্বামী

মন্তব্য করুন