ডাঃ দেবাশীষ কুন্ডু
এই মানুষটির নাম জন ডি. রকফেলার। প্রথম জীবনে রকফেলার যখন ঘণ্টায় মাত্র চার সেন্টের বিনিময়ে কাঠফাটা রোদের নিচে আলু ক্ষেতে লোহার কোদাল নিয়ে কাজ করেছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবেরের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা কয়েকজন। জন ডি. রকফেলার তাঁর অপরিসীম অধ্যবসায় ও পরিশ্রমের ফলশ্রুতিতে দুই বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন।
রকফেলার তাঁর মাকে হাঁস-মুরগি পালনে সাহায্য করে তাঁর জীবনের প্রথম ডলারটি উপার্জন করেছিলেন। তিনি মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত তাঁর সুবিশাল আট হাজার একর জমিতে চমৎকার এক পাল মুরগি পুষতেন যেগুলো দেখে তিনি তাঁর শৈশবস্মৃতি মনে করতেন।
রকফেলারকে তার মা মুরগি পোষার জন্য যে অর্থ দিতেন তা তিনি খরচ না করে একটা ফাটা অব্যবহৃত চায়ের পেয়ালায় জমাতেন। এ ছাড়াও দিনে ৩৭ সেন্টের বিনিময়ে এক কৃষিখামারে কাজ করতেন। প্রথম অবস্থায় ৫০ ডলার না হওয়া পর্যন্ত তিনি পুরো পারিশ্রমিকটাকেই জমা করতেন। এরপর ওই ৫০টি ডলার শতকরা ৭ ডলার সুদে তার নিয়োগকর্তাকেই ধার দিলেন। তিনি দেখলেন যে দশ দিন কঠোর শ্রম দিয়ে তিনি যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারেন, ঐ বিনিয়োগকৃত পঞ্চাশ ডলার তার জন্য এক বছরে সমপরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম। তিনি বলেছেন, ‘আমি নিজে টাকার দাস না হয়ে টাকাকেই আমার দাস বানাব।’
প্রথম জীবনে রকফেলার যে মেয়েটির প্রেমে পড়েছিলেন সে মেয়েটি তাঁকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেছিল। মেয়েটির মা বলেছিলেন, ‘রকফেলারের মতো একজন স্বল্প আয়সম্পন্ন মানুষ যার উন্নতির আশা অত্যন্ত ক্ষীণ, তার হাতে সঁপে দিয়ে আমার মেয়েকে জলে ভাসিয়ে দিতে পারি না।‘ অথচ এই লোকটিই পরবর্তীকালে আমেরিকার বিখ্যাত ধনকুবের উলওয়ার্থ, ডিউক ও হ্যারিম্যান একত্রে যত অর্থ সম্পদ উপার্জন করেছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থ সম্পদ অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৯০০-এর দশকে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৯০% তেল শোধনাগারের মালিক ছিলেন এবং এই সময়েই বিশ্ব পেট্রোকেমিক্যালসের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল, যা প্লাস্টিক, লোশন, ক্রিম, মলম ইত্যাদির মতো পণ্য তৈরির কাঁচামাল।
এছাড়াও, এই সময়ে মানুষের রোগের চিকিৎসা মূলত হোমিওপ্যাথি, ন্যাচারোপ্যাথি, কাইরোপ্র্যাকটিক, ভেষজ ঔষধ, অ্যারোমাথেরাপি এবং এসেনশিয়াল অয়েলের উপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতো।
১৮৩৯ সালে জন্মগ্রহণকারী এবং ১৯৩৭ সালে মৃত্যুবরণকারী রকফেলার ছিলেন একজন আমেরিকান ব্যবসায়ী এবং আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।
যেহেতু রকফেলার পেট্রোলিয়াম শিল্পে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করছিলেন, তাই তিনি পেট্রোকেমিক্যালস বিক্রির মাধ্যমে চিকিৎসা শিল্প থেকে মুনাফা অর্জনের একটি কৌশল তৈরি করেন।
অ্যান্ড্রু কার্নেগি নামে আরেকজন ব্যবসায়ীর সাথে মিলে তারা আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (এএমএ) প্রতিষ্ঠায় অর্থায়ন করেন এবং এর উপর প্রভাব বিস্তার করেন। এই সংস্থাটিই চিকিৎসা শিক্ষার পুনর্গঠন এবং চিকিৎসা খাতকে "মানসম্মত" করার ঘৃণ্য প্রক্রিয়া শুরু করে।
রকফেলার এবং কার্নেগির প্রভাবে, আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন কার্যত এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যা চিকিৎসা শিক্ষা প্রদানকারী যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তাদের প্রথম পদক্ষেপ ছিল ১৯১০ সালের ফ্লেক্সনার রিপোর্ট নামে পরিচিত একটি গবেষণায় অর্থায়ন করা, যেখানে এই সিদ্ধান্তে আসা হয় যে প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো "অবৈজ্ঞানিক হাতুড়েগিরি"।
এরপর রকফেলার কংগ্রেসকে ১৯১০ সালের ফ্লেক্সনার রিপোর্টটি গ্রহণ করার জন্য প্রভাবিত করেন, যা মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
প্রচারণা এবং গণমাধ্যম অভিযানের মাধ্যমে, আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোকে মানুষের অস্তিত্বের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে ধারাবাহিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও অসম্মানিত করতে থাকে।
এর ফলে চিকিৎসা পাঠ্যক্রম থেকে প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো বাদ দেওয়া হয় এবং চিকিৎসা শিক্ষা থেকে পুষ্টির বিষয়টি মুছে ফেলা হয়। (এ কারণেই ডাক্তারদের পুষ্টি সম্পর্কে শেখানো হয় না) এটি ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছিল।
যেসব বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা শিক্ষা দিত, তাদের এই শর্তে বিপুল পরিমাণ অনুদান দেওয়া হয়েছিল যে তারা হোমিওপ্যাথির নিন্দা করবে এবং চিকিৎসার জন্য অ্যালোপ্যাথিক পদ্ধতির উপর মনোযোগ দেবে।
শিক্ষার স্তরে, রকফেলার-অর্থায়িত পরীক্ষায় শুধুমাত্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের (যারা সর্বোচ্চ নম্বর পেত) রকফেলার-অর্থায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে পড়ার জন্য শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হতো।
কেন মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের টার্গেট করা হয়?
কারণ, একবার একজন "মেধাবী শিশুকে" মতাদর্শে দীক্ষিত ও মগজ ধোলাই করতে পারলে, তারা কেবল আপনাকেই অনুসরণ করবে।
তারা আবেগভরে আপনার এজেন্ডা রক্ষা করবে এবং যেহেতু সাধারণ মানুষ তাদের "সমাজের সেরা অংশ" হিসেবে দেখে, তাই তারা তাদের কথা বিশ্বাস করবে।
মানে, লন্ডন বা ম্যাসাচুসেটসে তৈরি ও প্রকাশিত কোনো পরীক্ষায় যে সব বিষয়ে এ গ্রেড পেয়েছে, তাকে কে না বিশ্বাস করবে?
এরপর রকফেলার কংগ্রেসে বসার জন্য নির্বোধ রাজনীতিবিদদের নির্বাচনে অর্থায়ন করেছিলেন, যাতে তারা এমন আইন তৈরি করতে পারে যা তার পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রির পক্ষে যায়।
রাজনীতিবিদদের এই ঘুষ দেওয়াকেই তারা "লবিং" বলে, অথচ বাস্তবে এটি ঘুষ এবং দুর্নীতি।
এখান থেকেই রকফেলারের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য প্রসারিত হয়েছিল, যখন তিনি তার পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যগুলোকে ওষুধের ছদ্মবেশে বিক্রি করতে শুরু করেন। এগুলো ছিল ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট, ক্রিম, লোশন, লিপ বাম, শ্যাম্পু এবং পাউডার।
রকফেলার চিকিৎসাব্যবস্থার পতন ঘটিয়েছিলেন এবং চিকিৎসা শিক্ষাকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পগুলোর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো বিপাকীয় রোগের চিকিৎসার জন্য প্রাথমিক থেরাপি হিসেবে পুষ্টির ব্যবহারকে সরিয়ে দেন।
চিকিৎসাকর্মীদের প্রশিক্ষণ একটি প্রতারণা, যা সিস্টেম-প্রশিক্ষিত এবং মতাদর্শে দীক্ষিত রকফেলারের রাষ্ট্রদূত তৈরি করে।
আধুনিক চিকিৎসার অনুশীলন একটি ভ্রান্ত ধারণায় পরিণত হয়েছে। এটি একটি ব্যবসায়িক মডেল যা মানুষের কাছে ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য বিক্রি করে।
এটি রোগীর স্বার্থ রক্ষা করে না, বরং আধুনিক চিকিৎসার স্বার্থ রক্ষা করে।
এই ব্যবস্থায় আপনিই হলেন নগদ টাকার উৎস। আপনার স্বাস্থ্যই এই মুনাফাখোরদের জন্য লাভ তৈরি করছে। সুস্থ মানুষের মধ্যে কোনো টাকা নেই, মৃত মানুষের মধ্যেও কোনো টাকা নেই, টাকা আছে কেবল অসুস্থ মানুষের মধ্যে।