
পুরাণকথায় জানতে পারি দ্বাপরে শ্রীকৃষ্ণরূপে ঈশ্বর অবতীর্ণ হয়েছিলেন। প্রতি অবতারলীলাকেই বহু বিভঙ্গে আস্বাদ করেন রসিকজন – যৎ শৃন্বতাং রসজ্ঞানাং স্বাদু স্বাদু পদে পদে। তবে শ্রীকৃষ্ণ অবতারে বৃন্দাবনে তাঁর বাল্য ও কৈশোরের লীলামাধুর্য্য যেন সব চেয়ে বেশী প্রাণ ছুঁয়ে যায়।
কংস বালক কৃষ্ণকে মারতে বারে বারে অসুর পাঠান। কত বিচিত্র তাদের ছদ্মবেশ! মায়াবী দুরাত্মাদের কত রকমারি রূপ – বকাসুর, অঘাসুর, পুতনা! এরকমই এক অসুর হল ম্রেধ্রাসুর। সে ম্যাড়া বা ভেড়ার রূপ ধরে ব্রজকিশোরকে বধ করতে এসেছিল। যথারীতি সুবিধে করতে পারলো না। কংসের পাঠানো বাদবাকি অসুরগুলোর যে পরিণতি হয়েছিল — পুতনা, বকাসুর, অঘাসুরেরা যেমন ভগবানের হাতে ভবলীলা সাঙ্গ করেছিল, তেমনি একই গতি হয় ম্রেধ্রাসুরেরও ।
সেই ম্রেধ্রাসুর বধের স্মরণে আজও কুশপুত্তলিকা দহন হয় ফাল্গুনী পূর্ণিমার আগের রাতে। চলতি ভাষায় ‘ম্যাড়াপোড়া’ – অর্থাৎ ম্রেধ্রাসুর বধের একটি পুনরভিনয়। এ অনুষ্ঠানের পেছনে প্রহ্লাদের পিসি, হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকার অগ্নিদগ্ধ হওয়ারও একটি গল্প আছে। সে গল্পটি অবশ্য বেশী প্রচলিত। যাইহোক, দুটি কাহিনীরই মূল তাৎপর্য হল ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে আগুন জ্বালানো — যেন পুড়ে যায় মনের সব আসুরীবৃত্তি।
শব্দটা কিন্তু ‘ম্যাড়াপোড়া’, ‘ন্যাড়াপোড়া’ নয়। দ্বিতীয় শব্দটি আমাদের মত মুন্ডিতকেশ সাধু-সন্ন্যাসী বা সন্ন্যাসিনীদের পক্ষে বেশ বিপজ্জনক। আক্ষরিক অর্থ বুঝে নিয়ে কেউ যদি উৎসব উদযাপনের আয়োজন করে তো আমাদের সমূহ বিপদ!!!
ম্রেধ্রাসুর বিনাশ করে বৃন্দাবনচন্দ্র ব্রজে ফিরে এলেন। সব গোপ গোপিনীরা আনন্দে তাকে দোলায় বসিয়ে দোল দিতে শুরু করে আর ফাগ কুঙ্কুমে অভিনন্দিত করে। ভক্তবৎসল শ্রীহরি কি চুপ করে থাকবেন? করুণাময় ভগবান এবং ভক্তের মহামিলনের রঙে দোলপূর্ণিমার শুভতিথিতে রাঙা হয়েছিল বৃন্দাবনের রজ।
সেই যে রাধিকারঞ্জনকে রাঙিয়েছিল ব্রজবালারা – সেই যে তারা রসিয়া হোরি খেলেছিল – রঙের গাগরিতে, রঙিলা ঘাগরিতে রঙের মাতন লেগেছিল – আর মাধব সাথে মাধবিকারা উৎসব আনন্দে মেতে উঠেছিল, তারই স্মৃতিতে দোলপূর্ণিমা তিথির বাসন্তী সকালে গৃহবাসীরা দোর খোলে, স্থলে জলে বনতলে দোলা লাগে, রাশি রাশি রাঙা হাসি অশোক পলাশ থেকে চুঁইয়ে ঝরে পড়ে, আর সেই হাসির ঢেউ শিশুর কচি ঠোঁট থেকে ছড়িয়ে যায় তারুণ্যের চোখে মুখে। তারপর তা গড়িয়ে বয়ে যায় প্রৌঢ়-প্রৌঢ়াকে ছাপিয়ে বার্ধক্যের আঙিনাতেও।
এমন সার্বজনীন রঙের উৎসটা স্বয়ং ভগবান কমললোচন হরি কিনা, তাই ঈশ্বর-আনন্দের কণিকা রঙ-উৎসবকে স্বতন্ত্র করেছে। তাই তো মহাপ্রভু আজকের তিথিটিকেই তাঁর আবির্ভাবের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। তাই তো এই দিনে তিনি হরিপ্রেমে, হরিনামের বন্যায় ভাসিয়ে দিয়েছিলেন জগত। আজ নবদ্বীপচন্দ্র মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের পুণ্য জন্মতিথি।
ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জীবনের সাথেও দোলপূর্ণিমার কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তখন কাশীপুরে তিনি রোগশয্যায় শুয়ে আছেন। আর হাতে গোণা কয়েকটিমাত্র দিন তিনি থাকবেন ধরাধামে।
আইলা ফাগুন মাস এবে দোললীলা।
ঘরে ঘরে করে লোক আবিরের খেলা।।
শ্রীপ্রভুদেবের যত অন্তরঙ্গগণে।
একত্রিত হইলেন ফাগুয়ার দিনে।।
তারপর, রঙখেলার আনন্দ আয়োজন সম্পূর্ণ করে, তাঁরা নৃত্যগীতে মেতে উঠলেন। খোল করতাল কাঁসরের সাথে হরিধ্বনি ওঠে, লাল আবিরে সকলের মুখ চোখ, বসন-ভূষণ রঞ্জিত হয়, সঙ্কীর্তন দল এগিয়ে আসে শ্রীপ্রভু যে বাড়িতে থাকেন তার সামনে। তারপর বাড়ি প্রদক্ষিণ করে তাঁরা নাচতে শুরু করলেন। রোগজীর্ণ শরীর, লীলাকাল সমাপনের সময় হয়ে এসেছে – শ্রীরামকৃষ্ণ দেওয়াল ধরে, জানালার সামনে এসে দাঁড়ান। দাঁড়িয়ে দেখতে থাকেন ভক্তদের নৃত্য-গীত। কে বলে শরীরে তাঁর মারণ ব্যাধি?
প্রফুল্ল মুখারবিন্দ করে ঝলমল।
ভক্ত-মন-বিমোহন আনন্দের স্থল।।
তাঁকে জানালায় দেখতে পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে গান ধরলেন সকলে। গিরিশ ঘোষের ছোট ভাই মোটাসোটা অতুল ঘোষকে পাঁচ ছ জন মিলে শূন্যে তুলে লোফালুফি শুরু করে দিলেন। কেউ বা তাঁর উদ্দেশ্যে প্রণাম করে মাটিতেই গড়াগড়ি যান, কেউ বা শূন্যে আবির ছোড়েন। আবিরের রেণুতে কাশীপুর উদ্যানবাটীর পথ লালে লাল হয়।
এসময়ের আর একটি মর্মস্পর্শী ঘটনাও আমাদের ধ্যানের ধন হয়ে আছে। তখন দূরে দোলের হৈ চৈ চলছে, মাটিতে পাতা বিছানায় শুয়ে আছেন ব্রজেশ্বর শ্রীরামকৃষ্ণ, এসময় দুটি ছোট ছেলে – একটি মনীন্দ্র, অন্যটি পতু ঠাকুরকে হাওয়া করছিল। ছোট হাত টনটন করে, তাই একবার এ হাত – একবার ওহাত করে তারা হাওয়া করে চলেছিল। ঠাকুর দূর থেকে আনন্দোচ্ছ্বাস শুনতে পেয়ে তাদের পাখা বন্ধ করে ফাগ খেলতে যেতে বলেন বার বার। তারা কিন্তু ঠাকুরের সেবা ফেলে খেলতে গেল না। ভক্তের ভক্তির সামনে পরাজিত জগৎপতি সারদানাথ সেদিন চোখের জলে ভেসে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আরে, এরাই আমার রামলালা!’
এই মহাপুণ্য তিথির উদযাপনে মঠ মিশনের অনেক সেন্টারেই হয় চাঁচর (বহ্নি উৎসব), লোক প্রচলিত নাম ‘ম্যাড়াপোড়া’। আর পরদিন, একদিকে চলে – ‘ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল’ , অন্যদিকে ,’যাদের হরি বলতে নয়ন ঝরে তারা, তারা দু ভাই এসেছে রে’।
প্রব্রাজিকা বেদরূপপ্রাণা








