দেবাশীষ কুন্ডু
পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন এবং বিজেপির উত্থান রাজ্যের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় এনেছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে গৈরিকীকরণের ঢেউ এখন বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসেন। কৃষক আন্দোলন (সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম) তাঁকে গ্রামীণ জনসমর্থন এনে দেয়। মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ; শিল্পায়ন ব্যাহত করা, দুর্নীতি, তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের দাপট এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা ।
বিজেপির উত্থান ও গৈরিকীকরণ
বিজেপি বাংলায় ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে ভোট সংগঠিত করেছে। রামমন্দির আন্দোলন, দুর্গাপূজা ও হিন্দু আচার-অনুষ্ঠানকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বিজেপি বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রভাব বিস্তার করেছে। মুসলিম ভোটব্যাংক তৃণমূলের সঙ্গে থাকলেও হিন্দু ভোটের বড় অংশ বিজেপির দিকে সরে গেছে। বিজেপির উত্থান বাংলায় এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় পরিচয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে বহুত্ববাদ, বামপন্থা ও সাংস্কৃতিক উদারতার প্রতীক ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই চিত্র বদলে যাচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের পতন এবং বিজেপির উত্থান রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে এক মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে গৈরিকীকরণ—একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যা ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।
মমতার পতনের কারণসমূহ
স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের দুর্নীতি, কাটমানি অভিযোগ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ক্রমে বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের আন্দোলন মমতাকে ক্ষমতায় এনেছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে শিল্পায়নের অভাবে কর্মসংস্থানের সংকট তৈরি হয়। মমতার রাজনীতি মূলত আঞ্চলিক ছিল; জাতীয় পরিসরে তার প্রভাব সীমিত। বিজেপি এই শূন্যস্থান পূরণ করেছে জাতীয়তাবাদী বার্তা দিয়ে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে নারী-নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক নারীর ওপর নির্যাতনের ঘটনা—সন্দেশখালি, কামদুনি, আর.জি. কর হাসপাতাল, কলকাতা আইন কলেজ—রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই ঘটনাগুলিতে সরকারের প্রতিক্রিয়া ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান জনমনে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে, যা তাঁর রাজনৈতিক পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই ঘটনাগুলিতে সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল প্রতিরক্ষামূলক, সহানুভূতিশীল নয়। ফলে নারী ভোটারদের বড় অংশ তৃণমূল থেকে দূরে সরে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে একজন নারী নেতা হলেও, তাঁর প্রশাসন নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে—এটাই জনমতের বড় পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
বিজেপি ও অন্যান্য বিরোধী দল এই ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে “নারী-অসুরক্ষা” ইস্যুতে প্রচার চালিয়ে জনসমর্থন অর্জন করেছে। এই সামাজিক ক্ষোভ বিজেপির গৈরিক প্রচারের সঙ্গে মিশে গিয়ে এক বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্ম দিয়েছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী উদার সংস্কৃতিকে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা চলছে—যেখানে ধর্মীয় গৌরব ও জাতীয়তাবাদকে একত্রে তুলে ধরা হচ্ছে।
মমতার পতন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক যুগের অবসান। বিজেপির উত্থান এবং গৈরিকীকরণের প্রবাহ রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিকে নতুন পথে নিয়ে যাচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে জনগণ কতটা এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে গ্রহণ করে এবং বিজেপি তাদের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারে।