দেবাশীষ কুন্ডু
দেবী আদ্যাশক্তি হলেন সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জননী। যদিও তিনি সকল জীবের মা, তবুও বাঙালি সমাজে তাঁকে কন্যারূপে পূজা করা হয়। আশ্বিন মাসের এক শরতের ভোরে যখন ঢাকের আওয়াজ বেজে ওঠে, তখন পিতৃগৃহে আগমন ঘটে ‘দশপ্রহরণধারিণী’ মায়ের। তাঁর এই আগমনে শাক্ত মতাবলম্বীসহ সমগ্র বাঙালি সমাজে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। এ সময় কন্যা যেমন বাপের বাড়ি বেড়াতে আসেন, তেমনই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, শিশু-কিশোররা মেতে ওঠে বাংলার এই আনন্দ-উৎসবের পূজা-অর্চনা ও উৎসবে। আজ আমরা জানব দেবী দশভুজার সেই দশটি অস্ত্র সম্পর্কে। মা দুর্গার কোন হাতে কোন অস্ত্র থাকে এবং এই সব অস্ত্র ধারণের কারণ বা গুরুত্বই বা কী।
“জাগো, তুমি জাগো,
জাগো দুর্গা,জাগো দশপ্রহরণধারিণী!
অভয়া শক্তি-বল-প্রদায়িনী, তুমি জাগো।
জাগো অসুরবিনাশিনী, তুমি জাগো।
জাগো আলোকবর্তিকা নিখিলপ্রাণে,
জাগো আনন্দময়ী করুণাকরণে, তুমি জাগো।
জাগো তাপিত-জীবন-পারাবারে,
জাগো শান্তিসুধা-সমীরণে।
জাগো জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী।।”
এখানে দেবী দুর্গাকে ‘দশপ্রহরণধারিণী’ বলা হয়েছে। কিন্তু ‘দশপ্রহরণধারিণী’ শব্দটির অর্থ কী? আসলে, যিনি দশটি ‘প্রহরণ’ ধারণ করেন, তিনিই হলেন দশপ্রহরণধারিণী। আর ‘প্রহরণ’ শব্দের অর্থ হলো এমন কোনো বস্তু বা হাতিয়ার যা দিয়ে আঘাত করা হয়। অর্থাৎ, দেবী তাঁর দশটি হাতে দশটি অস্ত্র ধারণ করেন বলেই তাঁকে দশপ্রহরণধারিণী বলা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, দেবী কোন হাতে কোন অস্ত্রটি ধারণ করেন? এই প্রশ্নের সহজ উত্তরটি লুকিয়ে আছে দেবীর ধ্যানমন্ত্রে। হ্যাঁ, আমরা যদি দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি পাঠ করি এবং এর অর্থ ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করি, তবেই বুঝতে পারব কোন হাতে কোন অস্ত্রটি রয়েছে।
দেবী দুর্গার ধ্যানমন্ত্র:
জটাজুট সমাযুক্তাং অর্ধেন্দু কৃতশেখরাম্।
লোচনত্রয় সংযুক্তাং পূর্ণেন্দু সদৃশাননাম্।।২।।
অতসীপুষ্প বর্ণাভাং সুপ্রতিষ্ঠাং সুলোচনাম্।
নবযৌবন সম্পন্নাং সর্ব্বাভরণ ভূষিতাম্।।৪।।
সূচারু দশনাং তদ্বৎ পীনোন্নত পয়োধরাম্।
ত্রিভঙ্গস্থান সংস্থানাং মহিসাসুরমর্দীনিম্।।৬।।
মৃণালায়াত সংস্পর্শ দশবাহু সমন্বিতাম্।
ত্রিশুলং দক্ষিণে ধ্যেয়ং খর্গং-চক্রং ক্রমাদধঃ।।৮।।
তীক্ষ্ণবাণং তথা শক্তিং দক্ষিণেষু বিচিন্তয়েৎ।
খেটকং পূর্ণচাপঞ্চ পাশমঙ্কুশমেব চ।।১০।।
ঘণ্টাং বা পরশুং বাপি বামতঃ সন্নিবেশয়েৎ।
অধস্থান মহিষং তদ্বৎবিশিরক্ষং প্রদর্শয়েৎ।।১২।।
শিরোচ্ছেদোদ্ভবং তদ্বৎ দানবং খর্গ পাণিনম্।
হৃদি শুলেন নির্ভিন্নং নির্যদন্ত্র বিভূষিতম্।।১৪।।
রক্তারক্তী কৃতাঙ্গঞ্চ রক্তবিস্ফুরিতেক্ষণম্।
বেষ্টিতং নাগপাশেন ভ্রূকুটি ভীষণাননাম্।।১৬।।
সপাশ বামহস্তেন ধৃতকেশঞ্চ দুর্গয়া।
বমদ্রুধির বক্ত্রঞ্চ দেব্যা সিংহং প্রদর্শয়েৎ।।১৮।।
দেব্যাস্তু দক্ষিণাং পাদং সমং সিংহোপরিস্থিতম্।
কিঞ্চিৎ ঊর্ধ্বং তথা বামঅঙ্গুষ্ঠং মহিষোপরি।।২০।।
স্তুয়মানঞ্চ তদ্রূপ মমরৈঃ সন্নিবেশয়েৎ।
প্রসন্নবদনাং দেবীং সর্ব্বকাম ফলপ্রদাং।।২২।।
উগ্রচন্ডা প্রচন্ডা চ চন্ডোগ্রা চন্ডনায়িকা।
চন্ডা চন্ডবতী চৈব চন্ডরূপাতিচন্ডিকা।।২৪।।
অষ্টাভি শক্তিভিরষ্টাভিঃ সততং পরিবেষ্টিতাম্।
চিন্তয়েৎ জগতাং ধাত্রিং ধর্মকামার্থ মোক্ষদাম্।।২৬।।
ব্যাখ্যা:-
দেবীর মাথায় জটা, সাথে অর্ধচন্দ্রের মত কপাল। পূর্ণিমার চাঁদের মত মুখ তাঁর ও গায়ের রঙ অতসীফুলের মতো। তিনি সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত এবং তাঁর সর্বাঙ্গ বিভিন্ন অলঙ্কার দ্বারা ভূষিত। ।২-৪।
তাঁর দাঁত সুন্দর এবং ধারালো, স্তন সম্পূর্ণ। তিন ভাঁজে দাঁড়িয়ে তিনি দৈত্য নিধন করছেন। দশহাতভর্তি অস্ত্র তাঁর যা দেখতে শাখা-প্রশাখা সমন্বিত পদ্ম গাছের মতো। ডানদিকের উপরের হাতে অবস্থান করে ত্রিশুল, তারপর ক্রমান্বয়ে খর্গ এবং চক্র। ।৬-৮।
দেবীর দক্ষিণের সর্বনিম্ন দুই হাতের অস্ত্র ধারালো তীর এবং বর্শা। দেবীর ধ্যানে বর্ণিত হয় তাঁর বাঁ হস্ত। সেদিকে সবচেয়ে নিচের হাতে থাকে চামড়ার ঢাল ও তার উপরের হাতে ধনুক। সেগুলির উপরের হাতে থাকে সর্প, অঙ্কুশ এবং কুঠার (ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে)। দেবীর পায়ের কাছে দৈত্যরাজের মাথার স্থান। ।১০-১২।
মহিষের কাটা মাথা থেকে মহিসাসুরের দেহ অর্ধেক উত্থাপিত, হাতে তাঁর খর্গ এবং হৃদয়ে দেবীর ত্রিশূল দ্বারা বিদ্ধ। তাঁর পেট থেকে নাড়িভূঁড়ি নির্গত হয়েছে। শরীর রক্তলিপ্ত। দেবীর হাতে ধরা সাপ দ্বারা অসুরের দেহ বেষ্টিত। তবে উত্থিত ভ্রূ তে দৈত্যের রূপও ভয়ঙ্কর। ।১৪-১৬।
দেবী তাঁর বাম হাত দিয়ে দৈত্যরাজের চুল টেনে রেখেছেন। দেবীর ডান পা বাহন সিংহের উপরে এবং বাঁ পা কিঞ্চিৎ উর্ধে মহিষের উপরে অবস্থান করে। প্রবল যুদ্ধরত অবস্থাতেও দেবী তাঁর শান্তিপূর্ণ মুখাবয়ব ও আশীর্বাদী রূপ বজায় রেখেছেন এবং সমস্ত দেবতা দেবীর এই রূপের স্তুতি করেন। ।১৮-২২।
দেবীর উপরোক্ত রূপ দেবতাদের আট শক্তি উগ্রচন্ডা, প্রচন্ডা, চন্ডোগ্রা, চন্ডনায়িকা, চন্ডা, চন্ডবতী, চন্ডরূপ ও অতিচন্ডিকা দ্বারা পরিবেষ্টিত। গৃহকর্তার মানব জীবনের সমস্ত ইচ্ছা পূর্ণ করেন এই দেবী। তাই ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ লাভের জন্য জগন্মাতৃকা দেবী দুর্গার ধ্যানই মানবজাতির হওয়া উচিত। ।২৪-২৬।
বি.দ্র. : দেবীর ধ্যানমন্ত্রের তৃতীয় ছত্রে দেবীর গায়ের রং অতসীপুষ্পের মতো বলে বর্ণিত হয়েছে, তবে অনেক ক্ষেত্রেই এর ব্যতিক্রমও লক্ষ্য করা যায়। ‘তপ্ত কাঞ্চন বর্ণাভাং’ অর্থাৎ তপ্ত বা গরম গলিত সোনার সঙ্গেও দেবীর গায়ের রঙের তুলনা করা হয়েছে বিভিন্ন শাস্ত্রে। তবে এই দুটিই বহুল প্রচলিত এবং দেবীপ্রতিমাতেও দু’রকম রঙেরই ব্যবহার দেখা যায়। ত্রিশূলটি দক্ষিণ দিকে এবং খড়্গ-চক্র ‘ক্রমধা’ অর্থাৎ, ক্রম অনুসারে বিন্যস্ত। অর্থাৎ, দেবী তাঁর ডান হাতে ওপরের দিকে ত্রিশূল, খড়্গ, চক্র, তীক্ষ্ণ অস্ত্র ও শক্তি ধারণ করেন। অন্যদিকে, বাম হাতে নিচের দিকে তিনি খেটক (ঢাল), দীর্ঘ শর, পাশ, অঙ্কুশ, ঘণ্টা অথবা কুঠার ধারণ করেন। তবে অনুবাদের পার্থক্যের কারণে এই দশটি অস্ত্রের নাম নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই সাধারণত দেবীর হাতে শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম, ত্রিশূল, খড়্গ, ধনু, ঘণ্টা, নাগপাশ ও বজ্রাস্ত্র দেখা যায়। সুধী দর্শকবৃন্দ, আসুন এবার দেবী দুর্গার এই দশটি প্রথাগত অস্ত্রের গুরুত্ব ও তাৎপর্য জেনে নেওয়া যাক।
শঙ্খ
মহিষাসুরের সাথে যুদ্ধের আগে বরুণ দেব দেবী দুর্গাকে একটি শঙ্খ প্রদান করেছিলেন। দেবী দুর্গা বরুণ দেবের দেওয়া সেই দিব্য শঙ্খটি তাঁর বাম হাতে ধারণ করেছিলেন। আমরা জানি যে শঙ্খধ্বনি অত্যন্ত শুভ এবং এটি মহাজাগতিক জাগরণের প্রতীক। এছাড়া, প্রাচীনকালে যুদ্ধের শুরুতে শঙ্খ বাজিয়ে শত্রুপক্ষকে যুদ্ধের বার্তা বা সংকেত দেওয়া হতো। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, সৃষ্টির শুরুতে যখন সমগ্র বিশ্ব জলমগ্ন ছিল, তখন শ্রীবিষ্ণু সমুদ্রের তলদেশে শঙ্খের ওপর শয়ন করে ছিলেন। পরবর্তীতে দেবতাদের প্রার্থনায় শ্রীবিষ্ণু শঙ্খরূপে সমুদ্র থেকে উঠে আসেন। এছাড়া সমুদ্রমন্থনকালে শঙ্খের উদ্ভব এবং শঙ্খ নামক অসুরের অমরত্ব লাভের ঘটনার কারণেও সনাতন ধর্মে শঙ্খের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
চক্র
অশুভ শক্তির বিনাশকারী দেবী দুর্গাকে ভগবান বিষ্ণু এই চক্রটি উপহার দিয়েছিলেন। দেবীর ডান হাতে এই সুদর্শন চক্রটি শোভা পায়। এখানে 'সু' শব্দের অর্থ সুন্দর এবং 'দর্শন' শব্দের অর্থ যা দেখা যায় বা দৃশ্যমান। অর্থাৎ, দ্রুত গতিতে ঘূর্ণায়মান এই সুদর্শন চক্রটি স্বয়ং মহাবিশ্বের মতোই উজ্জ্বল ও সুন্দর; যার কেন্দ্রবিন্দু থেকে সমস্ত জ্যোতি ও শক্তি ছড়িয়ে পড়ে। সেই কেন্দ্রে নিহিত শক্তির স্বরূপ হয়তো আমাদের অজানা। দেবীর হাতে এই মহাজাগতিক চক্রের উপস্থিতি আমাদের এটাই বোঝায় যে, তিনিই এই মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু—যেখান থেকে সেই অসীম জ্যোতি ও শক্তি বিকিরিত ও প্রসারিত হয়। কারণ দেবী হলেন প্রকৃতিরই মূর্ত প্রতীক; তিনিই এই মহাবিশ্বের বিধাত্রী ও নিয়ন্ত্রী। অর্থাৎ, সময় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এই মহাবিশ্ব বা সময়ের যে বিকাশ, তার মূলে রয়েছেন তিনিই—দেবী দুর্গা—যিনি সেই মহাজাগতিক শক্তিরই এক প্রকাশ।
গদা
মহিষাসুর বধের উদ্দেশ্যে আয়োজিত যজ্ঞের সময় স্বয়ং ধর্মরাজ যম দেবী মহামায়াকে তাঁর বাম হাতের এই সুসজ্জিত গদা বা 'কালদণ্ড' প্রদান করেছিলেন। এই গদা বা কালদণ্ড গভীর ভালোবাসা, আনুগত্য ও ভক্তির প্রতীক; একই সঙ্গে এটি শক্তিরও প্রতীক। আমরা সকলেই 'কাল' বা 'মহাকাল'-এর প্রতি অনুগত, কারণ সময়ের ঊর্ধ্বে কেউ নন—মহাকালের গ্রাস সবকিছুকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই যম-প্রদত্ত এই অস্ত্রটি দেবী দুর্গার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আনুগত্যেরই বহিঃপ্রকাশ। আবার, দেবী দুর্গার হাতের এই গদা বা কালদণ্ডকে এক সম্মোহনী শক্তির আধার হিসেবেও দেখা হয়। দেবতা, দানব, মানব—অর্থাৎ সমস্ত ভালো ও মন্দ শক্তিই এই মহাশক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাছাড়া, মহিষাসুরকে বধ বা সম্মোহিত করার ক্ষেত্রেও এই গদা বা কালদণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
পদ্ম, অক্ষমালা ও কমণ্ডলু
বিশেষত, দেবী দশপ্রহরণধারিণীর হাতে একটি পদ্ম, একটি অক্ষমালা এবং একটি কমণ্ডলু শোভা পায়। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, এই তিনটি পবিত্র বস্তু ব্রহ্মা তাঁর সৃষ্ট জীবদের উপহার দিয়েছিলেন। পদ্ম পদ্মপাতার ওপর জন্ম নিলেও তা সর্বদা নির্মল ও পবিত্র থাকে; তাই পদ্মকে আলো থেকে অন্ধকারের পথের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। আমাদের সনাতন শাস্ত্রে সমগ্র জীবজগৎ বা সৃষ্টিকে একটি প্রস্ফুটিত পদ্মের সাথে তুলনা করা হয়েছে। তাছাড়া, পদ্মের এই অকলঙ্ক পবিত্রতার কারণেই আমাদের অনেক দেব-দেবী প্রস্ফুটিত পদ্মের ওপর অধিষ্ঠান করেন। পদ্ম ছাড়াও, দেবী দুর্গা ব্রহ্মার প্রদত্ত অক্ষমালা ও কমণ্ডলু ধারণ করেন, যা মূলত পবিত্রতারই প্রতীক।
ত্রিশূল
মহিষাসুরকে বধ করার সময় দেবী দুর্গার প্রধান অস্ত্র ছিল ত্রিশূল। আপনারা জানেন যে, ত্রিশূল মূলত মহাদেবের অস্ত্র ছিল; মহিষাসুর বধের উদ্দেশ্যে আয়োজিত সেই বিশেষ মুহূর্তে তিনি এটি মহাদেবীকে প্রদান করেছিলেন। শাস্ত্র অনুযায়ী, ত্রিশূল হলো তিনটি ফলাযুক্ত একটি দণ্ড, যা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রতীক। আবার, ত্রিশূলের এই তিনটি ফলায় তিনটি গুণের উপস্থিতি রয়েছে। গুণ তিনটি হলো—সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ। আপনাদের অনেকেই জানেন যে, ত্রিশূলের মাঝখানের ফলাটি সত্ত্ব গুণের আধার এবং অন্য দুই পাশের ফলা দুটি রজঃ ও তমঃ গুণের প্রতীক।
খড়্গ
দেবীর ডান হাতে একটি উজ্জ্বল লাল রঙের খড়্গ বা ছোরা দেখা যায়। এই খড়্গ মূলত ভীতিকর শক্তির প্রতীক। এই খড়্গ দিয়েই দেবী মহামায়া অসুরের মস্তক ছিন্ন করেছিলেন এবং সেই মুণ্ডমালা নিজের গলায় ধারণ করেছিলেন। 'শ্রীশ্রীচণ্ডী'র বর্ণনা অনুযায়ী, অসুর বধের সময় দেবী চামুণ্ডা তাঁর হাতের রক্তবর্ণ খড়্গ দিয়ে অশুভ শক্তিকে বিনাশ করেছিলেন। আমরা জানি, অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণের ৪৮ মিনিট সময়ে দেবী দুর্গাকে চামুণ্ডা রূপে পূজা করা হয়। সাধারণত এই সময়ে দেবীর উদ্দেশ্যে বলিদান করা হয়ে থাকে এবং সেই বলিদানের প্রধান অস্ত্র হলো এই খড়্গ। তবে পশুবলি, কুমড়ো বা অন্যান্য বস্তুর বলিদান প্রথা প্রচলিত থাকলেও, প্রকৃত বলিদান হলো মানুষের বিবেক ও বুদ্ধিতে লুকিয়ে থাকা অশুভ সত্তাকে বিনাশ করা। অর্থাৎ, ঈর্ষা, বিদ্বেষ, ক্রোধ ও অহংকারসহ ছয়টি রিপু বা দোষ থেকে নিজেকে শুদ্ধ করার প্রক্রিয়াই হলো এই বলিদানের প্রকৃত অর্থ। তাই দেবীর হাতের এই খড়্গ পরম মুক্তির প্রতীক। অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে মুক্তি ও স্বাধীনতা প্রদানের জন্য এই খড়্গ সর্বদা প্রস্তুত।
ধনুক ও তীর
দেবী মহামায়ার ডান হাতে ধনুক ও তীর শোভা পায়। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, মহিষাসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শুরুতে বায়ুদেব দেবী দুর্গাকে এই ধনুকটি প্রদান করেছিলেন। রণক্ষেত্রে ধনুক একটি অপরিহার্য অস্ত্র; দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুর নিধনের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে বাস্তবিক অর্থে, এই ধনুকটি একটি সুনির্দিষ্ট ও অবিচল লক্ষ্যের প্রতীক। জীবনের নানা পর্যায়, মুহূর্ত বা ঘটনা প্রতিনিয়ত আমাদের বিভিন্ন পরীক্ষার সম্মুখীন করে—যা আমাদের কাছে এক ধরণের যুদ্ধেরই নামান্তর। তাই সেই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও অবিচল লক্ষ্য স্থির করা আমাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আর সঠিক লক্ষ্য ও সঠিক পথ বেছে নিতে পারলে জীবনের সব ধরণের জটিল পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তাই রণক্ষেত্রে দেবীর হাতে সেই লক্ষ্যের প্রতীক হিসেবেই ধনুক ও তীর শোভা পায়।
অর্ঘ্যং পুষ্পঞ্চ নৈবেদ্যং মাল্যং মলয় বাসিনী । গৃহাণ
বরদে দেবী কল্যাণ কুরুমে সদা ।। কৃতাপূজা ময়াভক্ত্যা
নবদুর্গে সুরার্চিতে।। ভুক্তা ভোগান্ বরং দত্ত্বা
কুরু ক্রীড়াং যথাসুখং ।।
দারিদ্র্য রোগ শোকঞ্চ দারুনং বন্ধুস্বজন বৈরাগ্যং ।
দুর্গে ত্বং হরং দুর্গতিং ।।
রাজ্যং তস্য প্রতিষ্ঠা ত লক্ষ্মীস্তস্য সদা স্থিরা ।।
প্রভুত্বং তস্য সামর্থ্যং যস্য ত্বং মস্তকোপরি ।।
ধন্যোহহং কৃতকৃত্যেহহং সফলম্ জীবনম্ মম।।
আগতাসি যত দুর্গে মাহেশ্বরী মমালয়ং ।।
ওঁ হ্রীং দূ্র্গে দূ্র্গে রক্ষণি স্বাহাঃ।।