সনাতন ধর্মালম্বীদের পূজা-পার্বণ ও প্রার্থনার অন্যতম প্রধান একটি উপাদান হলো ‘অঞ্জলি’ প্রদান। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে অঞ্জলি বলতে ঈশ্বরকে পুষ্প, বেলপাতা ও জল নিবেদনের একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাকে বোঝায়। কিন্তু আধ্যাত্মিক দিক থেকে বিচার করলে অঞ্জলির গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর ও তাত্পর্যপূর্ণ। কেবল বাহ্যিক আচার হিসেবে নয়, অঞ্জলি নিবেদনের মাধ্যমে ভক্তের অন্তরের ভক্তি, আত্মসমর্পণ ও অহংকার ত্যাগের মানসিকতা প্রকাশিত হয়।
অঞ্জলি ও 'করপুট'-এর ধারণা:
পূজা বা প্রার্থনার সময় সাধারণত আমরা দুই হাত জোর করে এবং তালু দুটিকে একসাথে একটি পাত্রের মতো আকার দিয়ে অঞ্জলি নিই। দুই হাতের এই বিশেষ অবস্থানকে সংস্ক্রিতে বলা হয় 'করপুট' বা 'পবিত্র পাত্র'।
ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে আমরা অঞ্জলি প্রদানের সময় হাতের মুঠোয় যে ফুল ও বেলপাতা রাখি, তা কেবল পার্থিব কোনো বস্তু নয়। আধ্যাত্মিক তত্ত্ব অনুযায়ী, হাতের তালুতে থাকা এই পুষ্প ও বেলপাতা হলো আমাদের অন্তরের কামনা, বাসনা, রাগ, হিংসা, অহংকার এবং বিগত কর্মফলের প্রতীক। ফলে করপুটে এসব উপচার ধারণ করে যখন আমরা অঞ্জলি দিই, তখন প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের সমস্ত প্রবৃত্তি ও কর্মফল ঈশ্বরকে অর্পণ করি।
আত্মঅহংকার ও 'আমিত্ব' আত্মসমর্পণ
মনুষ্যজীবনের অন্যতম বড় বাধা হলো ‘আমিত্ব’ বা অহংকার। অঞ্জলি দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো এই অহংকার ও আমিত্বকে ঈশ্বরের শ্রীচরণে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করা। ভক্ত যখন তার অন্তরের সমস্ত অহংকার, হিংসা ও অশুভ চিন্তাকে ঈশ্বরের চরণে সঁপে দেয়, তখনই তার মধ্যে ঈশ্বরপ্রেম ও প্রকৃত জ্ঞান প্রকাশিত হয়।
তিনবার অঞ্জলি দেওয়ার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
সনাতন সংস্কৃতিতে সাধারণত তিনবার অঞ্জলি প্রদান করার বিধান রয়েছে। এই তিনবার অঞ্জলি প্রদানের পেছনে রয়েছে দেহ, মন ও বাক্যের ত্যাগের সংকল্প:
প্রথম অঞ্জলি (শরীরের অপবিত্রতা দূরীকরণ): প্রথমবার অঞ্জলি নিবেদনের অর্থ হলো আমাদের স্থূল শরীরের অপবিত্রতা দূর করা এবং তামসিক বিষয়বস্তু ত্যাগের সংকল্প গ্রহণ করা।
দ্বিতীয় অঞ্জলি (মনের অশুচিতা দূরীকরণ): দ্বিতীয়বার অঞ্জলি প্রদানের উদ্দেশ্য হলো আমাদের অন্তরের ও মনের অপবিত্রতা, কুচিন্তা ও অশুচিতাকে দূর করে মনকে নির্মল করা।
তৃতীয় অঞ্জলি (বাক্য ও কথার শুদ্ধি): তৃতীয় অঞ্জলির মাধ্যমে ভক্ত প্রার্থনা করে যেন তার মুখ থেকে কোনো অশুভ বা কটু কথা (কু কথা) বের না হয়। অর্থাৎ, এটি বাক্য শুদ্ধি ও সৎ বাক্যের অঙ্গীকারসূচক প্রার্থনা।
পরিশেষে বলা যায়, অঞ্জলি দেওয়া কেবল কিছু ফুল বা পাতা অর্পণের আচারমাত্র নয়। তাই শুধু পুষ্প অঞ্জলি না দিয়ে, নিজের মন, প্রাণ, বাক্য ও চেতনাকে পরমেশ্বরের শ্রীচরণে সঁপে দেওয়াই হলো অঞ্জলির প্রকৃত উদ্দেশ্য। অন্তরের ভক্তি ও নির্মল চেতনা নিয়ে নিবেদিত অঞ্জলিই মানুষকে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভে সহায়তা করে।