দেবাশীষ কুন্ডু
মা কালী দশ মহাবিদ্যার প্রথম এবং প্রেম, মাতৃত্ব, ক্রোধ, সংহারক এবং তান্ত্রিক বিদ্যার প্রতীক।
তান্ত্রিক বিদ্যার প্রকারভেদ ও উপপ্রকারভেদ রয়েছে । তন্ত্র বিদ্যার আরও উপবিভাগ রয়েছে, যেমন অগ্নি তন্ত্র, বায়ু তন্ত্র, তন্ত্র তন্ত্র, সন্মোহন তন্ত্র এবং আরও অনেক কিছু।
এছাড়াও কালীর উপপ্রকার, রূপ ও প্রতিবিম্ব রয়েছে, যারা এগুলোকে দেখে বা নিয়ন্ত্রণ করে। তোড়লতন্ত্র অনুসারে দেবী কালী অষ্ট প্রকারের হয়ে থাকেন যথা মহাকালী, দক্ষিণাকালী, শ্রীকালী, গুহ্যকালী, চামুণ্ডাকালী, সিদ্ধকালী, শ্মশাণকালী ও ভদ্রকালী। অভিনব গুপ্তের তন্ত্রলোক ও তন্ত্রসার গ্রন্থ দুটিতে ত্রয়োদশ কালীর উল্লেখ পাওয়া যায় যেমন- চণ্ডকালী, রক্তকালী, মহাভৈরবঘোরকালী, মহাকালী, কালাগ্নিরুদ্রকালী, যমকালী, মৃত্যুকালী, রুদ্রকালী, সৃষ্টিকালী, পরমার্ককালী, স্থিতিকালী, মার্তণ্ডকালী ও সংহারকালী। মুণ্ডকোপনিষদে দেবীকে কালী, কারালী, সুলোহিতা, স্ফুলিঙ্গিনী, বিশ্বরুচি, মনোহরা, সুধূম্রবর্ণা ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে। মহাকাল সংহিতার অনুস্মৃতিপ্রকরণে নয় প্রকার কালীর কথা বলা হয়েছে যথা; দক্ষিণাকালী, গুহ্যকালী, ভদ্রকালী, কামকলাকালী, কালকালী, শ্মশাণকালী, সিদ্ধিকালী, ধনকালী ও চণ্ডীকালী।
গুহ্যকালিকা রূপটি হলো কালীর শক্তির তৃতীয় রূপ।
কালী কালেশ্বরী নামেও পরিচিত, কারণ তাঁর প্রিয় রঙ হলো গাঢ় কালো।
গুহ্য মানে নারীশক্তির গুপ্ত শক্তি। অর্থাৎ, কালীর যে গুপ্ত নারীশক্তি গুহ্যকালী নামে পরিচিত, সেটিই তার গুপ্ত নারীশক্তি।
গুহ্যকালী ঘুয়াকালীর সাহায্যকারী এবং পুরুষ শক্তির ভারসাম্য হল ঘায়ত শিবায়।
ঘায়ত শিবায়কে ঘায়তকালও বলা হয়। ঘায়ত কাল হল ভগবান মহা শিবের শক্তি যখন কালীকে ঘুয়া কালীতে বিভক্ত করা হয়।
ঘুয়া কালী হল কালীর লুকানো, গোপন, অদেখা শক্তি।
অর্থাৎ তিনি কালীর উদর থেকে উন্মোচিত হয়েছেন, তাই তাঁকে ঘুয়া কালী বলা হয়।
অন্য ব্যাখ্যায় ঘায়ত মানে তিনি মহাকালের মুখ থেকে উন্মোচিত হয়েছেন, তাই তিনি তাঁকে ঘায়ত কাল বলেছেন।
নেপালের কাঠমান্ডুতে যে শক্তি পীঠস্থান আছে তা এই দেবীর, দেবীর নাম গুহ্যেশ্বরী কিন্তু কোন মূর্তি সেখানে নেই।
দেবী গুহ্যকালী সূর্যকালী নামেও পরিচিতা যা থেকে স্পষ্টত সূর্যদেবও দেবীর উপাসনা করেছেন।
স্বরূপ ও রূপ: সাধারণ কালীর বহু হাত থাকলেও, গুহ্যকালী দ্বিভুজা (দুই হাত বিশিষ্ট), খড়্গহস্তা, সর্পভূষিতা (সাপের অলঙ্কার পরা), লোলজিহ্বা এবং নরমুণ্ডমালাধারী। তাঁকে 'সূর্যকালী' বা 'আকালী' নামেও ডাকা হয়। তন্ত্রশাস্ত্রে তাঁর যে রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়, তা সাধারণ কালীর চেয়ে অনেকটাই আলাদা এবং অনেক বেশি সংহারী ও রহস্যময়।
দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে, দেবী শতাক্ষীর শরীর থেকে এই মহাশক্তির উৎপত্তি হয়েছিল। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এর মূর্তিটি পৌরাণিক মগধরাজ জরাসন্ধের তৈরি।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার রামপুরহাট মহকুমার আকালীপুর গ্রামে ব্রাহ্মণী নদীর তীরে শ্মশানসংলগ্ন স্থানে এই দেবীর বিখ্যাত মন্দির রয়েছে। ১৭৭৫ সালে মহারাজা নন্দকুমার এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। শোনা যায়, মন্দিরের বিগ্রহটি জরাসন্ধের আরাধিত। এই দেবী সাধারণ গৃহস্থের দ্বারা পূজ্যা নন, একমাত্র উত্তম তান্ত্রিক মাতৃসাধকের দ্বারাই আরাধ্যা। মহাকাল সংহিতার গুহ্যকালী খণ্ডে গুহ্যকালীদেবীর বিভিন্ন ধরনের রূপের বিবরণ উল্লেখিত রয়েছে। তার মধ্যে দেবীর এই একমুখী স্বরূপ প্রজাপতি ব্রহ্মা দ্বারা পূজিত। মহাকাল সংহিতার ৫১জন মহাবিদ্যা তথা কাশ্মীর শৈবক্রমের অষ্টোত্তর শত মহাবিদ্যাদের অন্যতমা হলেন দেবী গুহ্যকালী। গুহ্যকালী মায়ের অসংখ্য মন্ত্র ও রূপ আছে। এই মন্ত্র কিন্তু অত্যন্ত ভয়ংকর ও গুপ্ত। মায়ের মূর্তি প্রথমে একমুখী তারপর ক্রমশঃ দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত, আট, নয়, দশ, এগার, বার, তের, ষোল, কুড়ি, একাশি, একশ, হাজার, দশহাজার ও একলক্ষ মুখী।
দেবী গুহ্যকালীর রূপসমূহ ও তাদের উপাসকেরা হলেন-
১) একমুখী রূপটিকে উপাসনা করেছিলেন ব্রহ্মা।
২) দুইমুখী উপাসক কাম দেব।
৩) তিনমুখী উপাসক বরুণ দেব।
৪) চারমুখী উপাসক অগ্নি দেব।
৫) পাঁচমুখীর উপাসক দেবতাদের মাতা অদিতি।
৬) ছয় মুখীর উপাসক ইন্দ্র পত্নী শচীদেবী।
৭) আটমুখীর উপাসক দৈত্যরাজারা।
৮) নয় মুখীর উপাসক যম।
৯) দশ মুখীর অনেক গুলি মন্ত্র আছে। তাঁদের উপাসনা করেছিলেন মহাবিষ্ণু, ইন্দ্র, রাম, ভরত, রাবণ, মহর্ষি চ্যবন, বশিষ্ট, হারীত, জাবাল, প্রজাপতিরা।
১০) একাদশ মুখীর উপাসক রুদ্র দেব।
১১) দ্বাদশমুখীর উপাসক দেবী মহাকালী নিজেই।
১২) ত্রয়োদশমুখীর উপাসক বিশ্বদেবরা।
১৩) ষোড়শমুখীর উপাসক সিদ্ধ লোকের সিদ্ধ-গণ।
১৪) কুড়িমুখীর উপাসক কিন্নররা।
১৫) একাশি মুখীর উপাসক সপ্তর্ষি-রা সাত জন।
১৬) শতমুখীর উপাসক ছিলেন হিরণ্যকশিপূ।
১৭) অযুতমুখীর উপাসক কালাগ্নিরুদ্র।
১৮) লক্ষ মুখীর উপাসক স্বচ্চন্দভৈরব নিজেই।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতি অমাবস্যার রাতে বা এবং বিশেষ করে কালীপূজার রাতে দেবী গুহ্যকালী গর্ভগৃহ বা মন্দির ছেড়ে বাইরে শ্মশান বা আশপাশে ভ্রমণ করেন। জনশ্রুতি আছে যে রাতে ঘুরে বেড়ানোর সময় তাঁর পরনের শাড়িতে নাকি শ্মশানের চোরকাঁটা লেগে যায় ।
গৃহস্থ বাড়ির পুজোয় এই রূপ সাধারণত অপ্রকাশ্য বা গোপনে রাখা হয়; মূলত তান্ত্রিক ও সাধকগণ এই রূপের আরাধনা করেন।
দেবী গুহ্যকালীর আরাধনা অত্যন্ত জটিল, গোপন এবং মূলত তান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সাধারণ গৃহস্থ বাড়িতে এই পুজো করা হয় না। তান্ত্রিক মতে তাঁর আরাধনা পদ্ধতির মূল দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
গোপনীয়তা (গুহ্য সাধন): 'গুহ্য' শব্দের অর্থ গোপন। তাই এই দেবীর উপাসনা অত্যন্ত গোপনে, লোকচক্ষুর অন্তরালে করতে হয়। সাধারণ সাধকদের জন্য এর নিয়মাবলী প্রকাশ করা নিষেধ।
সাধনকালে দেবীর ভয়াল রূপের ধ্যান করা হয়। ধ্যানমন্ত্রে তাঁকে সর্প অলঙ্কারে ভূষিতা, দ্বিমুখী সাপ দ্বারা বেষ্টিত এবং শ্মশানের পটভূমিতে কল্পনা করা হয়।
তন্ত্রের উচ্চতর সাধনায় এই পুজোয় 'পঞ্চমকার' (মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন) তত্ত্বের আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী প্রয়োগ ঘটে। তবে বীরভূমের আকালীপুর মন্দিরে সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে বা সাত্ত্বিক প্রথায় (বলিদান ছাড়া) দেবী গুহ্যকালীর পুজো করা হয়।
দেবীর নির্দিষ্ট গুহ্য মন্ত্র ও বীজ মন্ত্র রয়েছে, যা কেবল উপযুক্ত গুরু দীক্ষা বা তান্ত্রিক অভিষেকের মাধ্যমেই লাভ করা সম্ভব।
এই পুজো সাধারণত মহাশ্মশান, নির্জন অরণ্য বা গোপন তান্ত্রিক পীঠে করা হয়। অমাবস্যার গভীর নিশীথ রাত (বিশেষ করে মহানিশা) এই আরাধনার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
মহাকাল সংহিতা অনুসারে
দেবী গুহ্যকালীর মূল ধ্যানমন্ত্রের প্রথম শ্লোকটি নিচে দেওয়া হলো:
“মহামেঘপ্রভাং দেবীং কৃষ্ণবস্ত্রপিধায়িনীম্।
ললজ্জিহ্বাং ঘোরদংষ্ট্রাং কোটরাক্ষীং হসন্মুখীম্।।”
শব্দার্থ ও সরল ব্যাখ্যা:
মহামেঘপ্রভাং দেবীং: যে দেবীর শারীরিক আভা বা গায়ের রং আকাশের ঘন কালো প্রলয়কালীন মেঘের মতো।
কৃষ্ণবস্ত্রপিধায়িনীম্: যিনি ঘন কৃষ্ণবর্ণ বা কালো রঙের বস্ত্র (কাপড়) পরিধান করে আছেন।
ললজ্জিহ্বাং ঘোরদংষ্ট্রাং: যাঁর জিহ্বা লোলজিহ্বা বা মুখের বাইরে নির্গত এবং যাঁর দাঁত অত্যন্ত ভয়ংকর।
কোটরাক্ষীং হসন্মুখীম্: যাঁর চোখ দুটি কোটরাগত (গভীর ও তীক্ষ্ণ), কিন্তু গভীর ক্রোধের মাঝেও তাঁর মুখে একটি রহস্যময় হাসির আভা লেগে রয়েছে।
তন্ত্রোক্ত স্তোত্র ও ধ্যান অনুযায়ী মায়ের অন্যান্য প্রধান গুহ্য রূপগুলি হলো:
সর্পভূষণ: “নাগহারলতোপেতাং...” অর্থাৎ দেবী কোনো সাধারণ রত্ন অলঙ্কার পরেন না, তাঁর শরীরে জড়িয়ে থাকে বিষধর সাপের মালা বা নাগপাশ। তিনি তক্ষক সাপের অনন্ত কুণ্ডলীকে পায়ের মল এবং সুবর্ণনাগকে যজ্ঞোপবীত (পৈতে) হিসেবে ধারণ করেন।
শয়ান শিবের উপর অবস্থান: সাধারণ দক্ষিণাকালী শিবের বুকের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিন্তু গুহ্যকালী শিবের ওপর উপবিষ্ট বা শয়ান অবস্থায় থাকেন এবং অনেক ক্ষেত্রে শিব এখানে 'শবরূপ' (মৃতদেহ সদৃশ) ধারণ করেন।
দ্বিভুজা বা বহুভুজা: তন্ত্রের ধারা ভেদে মায়ের রূপের তফাত ঘটে। বীরভূমের আকালীপুরে তিনি দ্বিভুজা (দুই হাত বিশিষ্ট), এক হাতে খড়্গ ও অন্য হাতে নরমুণ্ড। আবার মহাকাল সংহিতা অনুযায়ী দেবীর বিশেষ সাধনায় তাঁর ১০টি মুখ এবং ৫৪টি হাত বিশিষ্ট রূপেরও ধ্যান করা হয়।
গুহ্যকালী বীজ মন্ত্র (তন্ত্রোক্ত):
শাস্ত্রে মায়ের আরাধনার জন্য বিভিন্ন জটিল বীজ মন্ত্রের উল্লেখ আছে। এর মধ্যে বহুল প্রচলিত কিছু বীজ বা তান্ত্রিক মন্ত্র হলো:
“ওঁ ফ্রেঁ”: এটি দেবীর একাক্ষরী বা মূল বীজ মন্ত্র ধরা হয়।
সম্পূর্ণ মন্ত্র :
“ওঁ ক্রেং ফ্রেং কোং ক্রোং পশূন্ গৃহাণ হুং ফট্ স্বাহা”
তন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী, দেবী গুহ্যকালীর যেকোনো মন্ত্র দীক্ষিত গুরু বা উপযুক্ত তান্ত্রিকের নির্দেশ ছাড়া জপ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এর ফলে মানসিক বা আধ্যাত্মিক ক্ষতি হতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয় ।
ঋষি ও সাধকদের দ্বারা রচিত দেবীর একটি বিশেষ স্তোত্র হলো 'গুহ্যকালী গদ্য সঞ্জীবনা স্তোত্রম্':
মহাকাল উবাচ —
ইদং স্তোত্রং পুরা দেব্যা ত্রিপুরঘ্নায় কীর্তিতম্ ।
ত্রিপুরঘ্নো অপি মাম্ প্রাদাৎ উপদিশ্য মনুং প্রিয়ে ॥ ১ ॥
গদ্যাকারং চ স বিভুঃ স্তোত্রং তস্যৈ চকার হ ।
ততঃ প্রভৃতি গদ্যং তৎ জীবন্ন্যাসভিধং মতম্ ॥ ২ ॥
নাম্নাং সহস্রং পঠতা পাঠ্যং তদপি পার্বতি ।
এতস্যাঃ কীর্তনাৎ দেবী তস্যাপি ন ভবেৎ ফলম্ ॥ ৩ ॥
আখ্যাতব্যমতো যত্নাত্ এতৎ গদ্যমপি প্রিয়ে ।
তস্য স্তোত্রস্য হি যতো জীবন্ন্যাসো অযমীরিতঃ ॥ ৪ ॥
এই স্তোত্রটিতে দেবীকে সমস্ত জাগতিক ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বিশ্বাস করা হয় এটি পাঠ করলে জীবনের যাবতীয় বড় বাধা, শত্রুর আক্রমণ এবং নেতিবাচক শক্তি দূর হয়।
॥ গুহ্যকালীর ধ্যান ॥
মা কালীর অন্যতম প্রধান ও শক্তিশালী রূপ হলো গুহ্যকালী বা আকালী। বিভিন্ন তন্ত্রশাস্ত্র (যেমন তোড়লতন্ত্র) অনুসারে দেবীর বিভিন্ন রূপ ও মন্ত্র রয়েছে। গুহ্যকালীর ধ্যান মন্ত্র সাধারণত দেবীর দশমুখী (দশবক্তা) রূপের বর্ণনা দিয়ে শুরু হয়।
শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুসারে গুহ্যকালীর আরাধনা ও মন্ত্র জপ উপযুক্ত তান্ত্রিক শিক্ষাগুরুর সান্নিধ্যে করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
॥ গুহ্যকালীর ধ্যান ॥
মহামেঘপ্রভাং দেবীং কৃষ্ণবস্ত্রপিধায়িনীম্।
ললজ্জিহ্বাং ঘোরদংষ্ট্রাং কোটরাক্ষীং হসন্মুখীম্॥
নাগহারলতোপেতাং চন্দ্রার্দ্ধকৃতশেখরাম্।
দ্যাং লিখন্তীং জটামেকাং লেলিহানাসবং স্বয়ম্॥
নাগযজ্ঞোপবীতাঙ্গীং নাগশয্যানিষেদুষীম্।
পঞ্চাশন্মুণ্ডসংযুক্ত-বনমালাং মহোদরীম্॥
সহস্রফণসংযুক্তমনন্তং শিরসোপরি।
চতুর্দ্দিক্ষু নাগফণাবেষ্টিতাং গুহ্যকালিকাম্॥
তক্ষকসার্পরাজেন বামকঙ্কণভূষিতাম্।
অনন্তনাগরাজেন কৃতদক্ষিণকঙ্কণাম্॥
নাগেন রসনাহারকল্পিতাং রত্ননূপুরাম্।
বামে শিবনরূপন্তৎ কল্পিতং বৎসরূপকম্॥
দ্বিভূজাং চিন্তয়েদ্দেবীং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম্।
নরদেহ সমাবদ্ধ কুণ্ডল শ্রুতিমণ্ডিতাম্॥
প্রসন্নবদনাং সৌম্যাং নবরত্নবিভূষিতাম্।
নারদাদ্যৈর্মুনিগণৈঃ সেবিতাং শিবমোহিনীম্॥
অট্টহাসাং মহাভীমাং সাধকাভীষ্টদায়িনীম্॥
বীজমন্ত্রঃ
ক্রীং ক্রীং ক্রীং হূং হূং হ্রীং হ্রীং
গুহ্যকালিকে ক্রীং ক্রীং ক্রীং হূং হূং হ্রীং হ্রীং স্বাহা॥
গায়ত্রীঃ
গুহ্যকালিকায়ৈ বিদ্মহে শ্মশানবাসিন্যৈ ধীমহি তন্নো ঘোরে প্রচোদয়াৎ॥
॥ প্রকারান্তর ধ্যান ॥
কৃঞ্চতোয়ৈশ্চ সম্পূর্ণে কৃষ্ণকুম্ভেঃথ কালিকাম্।
পঞ্চবক্ত্রাং মহারৌদ্রীং প্রতিবক্ত্রত্রিলোচনাম্॥
শক্তিশূলধনুর্ব্বাণ-খড়্গখেটবরাভয়ান্।
দক্ষাং দক্ষভুজৈর দেবীং বিদ্রুমভূষণাম্॥
ধ্যাত্বৈবং সাধকঃ সাধ্যং সাম্যেন্মনসি স্থিতম্॥
॥ অপর মন্ত্র ॥
ওঁ ক্রেং ফ্রেং কোং ক্রোং
পশূন্ গৃহাণ হুং ফট্ স্বাহা॥
নিচে গুহ্যকালীর ধ্যান — এর প্রতিটি শ্লোকের অর্থ দেওয়া হল —
মহামেঘপ্রভাং দেবীং কৃষ্ণবস্ত্রপিধায়িনীম।
ললজ্জিহ্বাং ঘোরদন্ত্রীং কটরাক্ষীং হসন্মুখীম॥
অর্থঃ
আমি ধ্যান করি সেই দেবীকে যাঁর দেহের আভা ঘন কালো মেঘের মতো, যিনি কালো বস্ত্র পরিহিতা। যাঁর জিহ্বা বাহিরে বেরোনো, দাঁত ভয়ংকর, চোখ তীক্ষ্ণ, ক্রুদ্ধ, কিন্তু মুখে হাসির আভা আছে।
নাগহারলতোপেতাং চন্দ্রার্ধকৃতশেখরাম।
চঞ্চল্লিখস্ত্রীং জটামেকাং লেলিহানাং স্বয়ংভুবাম্॥
অর্থঃ
যাঁর গলায় সাপের হার জড়ানো, যাঁর মাথায় অর্ধচন্দ্র শোভা পায়। তিনি অস্থিরভাবে বা চঞ্চলভাবে হাতে লেখনী বা লিখন-ভঙ্গি ধারণ করেন, এবং তাঁর আছে একটি বিশাল জটা, তিনি যেন নিজেই নিজেকে লীলায় প্রকাশ করছেন (স্বয়ম্ভূ), এবং জিহ্বা দিয়ে লেলিহান বা চাটছেন।
(এখানে “লেলিহান” মানে—ভক্ষণ বা গ্রাস করার শক্তি; “ভয়” নয়, “দমন” ও “রূপান্তর” শক্তি।)
নাগযজ্ঞোপবীতাঢ্যাং নাগশয্যানিষেভিণীম।
পঞ্চাশন্নাগসংযুক্তবনমালাং মহোদরীম॥
অর্থঃ
যাঁর গায়ে নাগ-যজ্ঞোপবীত (সাপকে উপবীতের মতো ধারণ), যিনি সাপের শয্যায় শয়ন বা আসীন। যাঁর গলায় আছে পঞ্চাশটি সাপযুক্ত বনমালা (বনফুলের মালা), এবং যাঁর উদর বৃহৎ (অসীম ধারণক্ষমতার প্রতীক)।
সহস্রফণসংযুক্তমনন্তং শিরসোপরি।
চতুর্দিক্ষু নাগফণাবেষ্টিতাং গুহ্যকালিকাম্॥
অর্থঃ
দেবীর শিরের উপর আছে সহস্র ফণা-যুক্ত অনন্তনাগ। আর চারদিকে দেবীকে ঘিরে আছে সাপের ফণার আবরণ। এই রূপেই তিনি গুহ্যকালী।
তক্ষকসার্পরাজেন বামকঙ্কণভূষিতাম।
অনন্তনাগরাজেন কৃতদক্ষিণকঙ্কণাম্॥
অর্থঃ
দেবীর বাম হাতে তক্ষক নামক সর্পরাজের কঙ্কণ বা বালা শোভা পায়, এবং ডান হাতে অনন্তনাগরাজের কঙ্কণ শোভা পায়।
নাগেন রসনাহারকল্পিতাং রত্ননূপুরাম।
বামে শিবনরূপেণ কল্পিতং বামরূপকম্॥
অর্থঃ
সাপ দিয়ে তাঁর জিহ্বা বা রসনার অলংকার গঠিত, এবং তাঁর পায়ে রত্নখচিত নূপুর আছে। আর তাঁর বাম পাশে শিব নররূপে অবস্থান করছেন যেন দেবীর বামভাব বা বামরূপ প্রকাশ পাচ্ছে।
দ্বিভূজাং চিন্তয়েদ্ দেবীং নাগযজ্ঞোপবীতিনীম।
নরদেহমমাবদ্ধকুণ্ডলশ্রুতিমণ্ডিতাম্॥
অর্থঃ
সাধক দেবীকে ধ্যান করবেন দুই হাতে (দ্বিভূজা) যিনি নাগ-যজ্ঞোপবীত ধারণ করেছেন। তিনি নরদেহে আবদ্ধ (মানবরূপে প্রকাশিতা), এবং কানে কুণ্ডল ও শ্রুতি-আভরণ (কর্ণালংকার) পরিহিতা।
গ্রন্থনবদনাং সৌম্যাং নবরত্নবিভূষিতাম।
নারদাস্থৈর্মুনিগণৈঃ সেবিতাং শিবমোহিনীম॥
অর্থঃ
দেবীর মুখ সৌম্য, তিনি নবরত্নে ভূষিতা। নারদ প্রমুখ মুনিগণ তাঁকে সেবা বা উপাসনা করেন। তিনি এমন শক্তিময়ী যে শিবকেও মোহিত করতে পারেন, তাই তিনি শিবমোহিনী।
ইষ্টদাং মহাভীমাং সাধকাভীষ্টদায়িনীম॥
অর্থঃ
তিনি ভক্তের ইচ্ছাপূরণকারিণী, রূপে মহাভয়ংকরী, এবং সাধকের অভীষ্ট (কাম্য ফল) প্রদান করেন।
এই ধ্যানে গুহ্যকালীকে দেখানো হয়েছে কুণ্ডলিনী বা গুহ্যশক্তি, শ্মশান-তত্ত্ব, নাগ-তত্ত্ব (প্রাণশক্তি), এবং শিব-শক্তির অদ্বৈত মিলন রূপে।
নিচে প্রকারান্তর ধ্যান — এর অর্থ দেওয়া হল —
কৃঞ্চতোয়ৈশ্চ সম্পূর্ণে কৃষ্ণকুম্ভস্থিতাং কালিকাম।
অর্থঃ
যে দেবী কালো জলে পূর্ণ (ঘন অন্ধকার জলে পরিপূর্ণ) অবস্থায় আছেন এবং যিনি কালো কুম্ভ/ঘটের মধ্যে অধিষ্ঠিতা সেই কালিকা দেবীকে ধ্যান করো।
এখানে “কৃষ্ণতোয়” হল কালো ঘন জল (অন্ধকার তত্ত্ব), “কৃষ্ণকুম্ভস্থিতা” হল কালো ঘটের মধ্যে অবস্হিত গুহ্য বা অন্তর্লীন শক্তির প্রতীক।
পঞ্চবক্ত্রাং মহারৌদ্রীং প্রতিপক্ষত্রিলোচনাম্॥
অর্থঃ
তিনি পঞ্চবক্ত্রা—অর্থাৎ পাঁচটি মুখযুক্ত, অত্যন্ত রুদ্ররূপিণী বা মহারৌদ্রী, এবং প্রতিটি মুখে ত্রিনয়না (তিন চোখবিশিষ্ট)।
“পঞ্চবক্ত্র” হল পাঁচ মুখ—পঞ্চতত্ত্ব বা পঞ্চশক্তির প্রকাশ।
“ত্রিলোচন” হল জ্ঞানচক্ষু, ত্রিকালদর্শিতা বা সর্বদর্শন।
শক্তিশূলধনুর্বাণ-খড়্গখেটবরাভয়ান্।
অর্থঃ
দেবীর হাতে রয়েছে শক্তি (বল্লম বা বর্শা), শূল, ধনুক, বাণ, খড়্গ (তরবারি), খেটক (ঢাল) এবং বরদান ও অভয়দান মুদ্রা।
অর্থাৎ দেবী একই সঙ্গে শাস্তি দেন, রক্ষা করেন, এবং কৃপা করে বর প্রদান করেন।
দধতীং দক্ষিণৈর্হস্তৈর্দেবীং বিদ্রুমভূষণাম।
অর্থঃ
দেবী ডান দিকের হাতে এই অস্ত্র-মুদ্রাগুলো ধারণ করছেন, এবং তিনি বিদ্রুম (প্রবাল বা লাল প্রবাল) অলংকারে ভূষিতা।
“বিদ্রুমভূষণা” মানে লালাভ প্রবাল অলংকার, এটি শক্তির তেজ বা রক্তিম জ্যোতি ও রৌদ্রশক্তির প্রতীক।
ধ্যাত্বৈবং সাধকঃ সাধ্যং সাম্যেন্মনসি স্থিতম্॥
অর্থঃ
এইভাবে দেবীকে ধ্যান করে সাধক নিজের সাধ্য বা লক্ষ্যকে (যে সিদ্ধি বা ফল কামনা করেন) মনঃস্থিত করবেন, অর্থাৎ মনকে স্থির করে দেবীতেই স্থাপন করবেন।
এখানে মূল কথা হল ধ্যানের শেষে মন স্থির করাই সিদ্ধির দরজা।
এই ধ্যানে গুহ্যকালীকে দেখা হয় গুহ্যস্থানে অবস্থিত, পঞ্চমুখী, ত্রিনয়না, অস্ত্রধারিণী রৌদ্রীশক্তি রূপে অর্থাৎ যিনি রক্ষা, দমন ও বরদান এই তিন কাজই করেন।
॥ মন্ত্র ॥
ওঁ ক্রেং ফ্রেং কোং ক্রোং পশূন্ গৃহাণ হুং ফট্ স্বাহা॥
ওঁ - পরমব্রহ্ম বা সর্বশক্তির আহ্বান, মঙ্গলধ্বনি।
ক্রেং ফ্রেং কোং ক্রোং হল দেবীর শক্তিকে জাগ্রত করার বীজধ্বনি (শক্তিসংকেত)।
পশূন্ হল পশুদের বা পশুভাবকে, তন্ত্রে “পশু” বলতে শুধু প্রাণী নয়—অজ্ঞান, কাম-ক্রোধ-লোভ, আসক্তি, ভীরুতা, বন্ধনগ্রস্ত মনকেও বোঝায়।
গৃহাণ হল গ্রহণ করো বা অধিকার করো বা বশে আনো।
হুং - তেজ, রক্ষা, ভেদন বা বিদারণ শক্তি; অশুভ নাশের ধ্বনি।
ফট্ – ছেদন বা বিচ্ছেদ বাধা, বন্ধন, অশুভ শক্তি কাটার ধ্বনি।
স্বাহা – সমর্পণ বা অর্পণ, মন্ত্রফল দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন।
এক কথায় মন্ত্রের সামগ্রিক ভাবার্থ হল - “হে গুহ্যকালী! তোমার শক্তি দ্বারা পশুভাব, বন্ধন, অশুভ প্রবৃত্তিগুলোকে গ্রহণ করে বশে আনো, ধ্বংস করো, সবকিছু তোমার চরণে সমর্পিত।”
বীজমন্ত্র- ক্রেং–ফ্রেং–কোং–ক্রোং
এগুলো চারটি শক্তিবীজ— একেকটি একেক রকম কাজের সংকেত দেয়।
(ক) ক্রেং : কালী বা ক্রিয়া-শক্তির বীজ, অশুভ নাশ, রক্ষাকবচ, শত্রুবাধা নিবারণ, ভয় কাটানো, মনকে দৃঢ় করে।
(খ) ফ্রেং : “ফ্র” ধ্বনি - দ্রুত ছেদন বা বিদারণ প্রবণ শক্তি, বাধা কেটে ফেলা, গ্রন্থি খুলে দেওয়া, অন্তরায় ধ্বংস সাধনায় “অবরোধ ভাঙা” কাজে ব্যবহৃত হয়।
(গ) কোং : আকর্ষণ বা আবরণ-শক্তির ইঙ্গিত, মন ও শক্তিকে অন্তর্মুখী করে, গুহ্য বা গোপন শক্তি জাগায়।
(ঘ) ক্রোং : কালীশক্তির আরও তীব্র রূপ, বন্ধন ছেদন, দুর্বলতা নাশ, দুষ্ট প্রবৃত্তি দমন, সাধককে রৌদ্র-তেজ দেয়।
ক্রেং (রক্ষা+দমন),
ফ্রেং (ছেদন),
কোং (আকর্ষণ বা অন্তর্মুখ)
ক্রোং (তীব্র দমন)
“পশূন্ গৃহাণ” — এখানে “পশু” বলতে— তন্ত্রভাষায় “পশু” কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, অহংকার ও দেহ-আসক্তি, ভয়, সংশয়, দ্বিধা, অজ্ঞানজনিত বন্ধন, কখনো কখনো বাহ্যিকভাবে বাধাদানকারী অশুভ শক্তি বা দুষ্ট প্রভাব। অর্থাৎ দেবীকে বলা হচ্ছে; মা তুমি এই পশুভাবগুলোকে “গ্রহণ করে” বশে এনে শুদ্ধ করো বা দমন করো।
সাধারণভাবে, শাস্ত্রীয় ভাষায় এই মন্ত্র জপের ফল হিসেবে সাধকের মধ্যে ভয় দূর হয়, সাহস বাড়ে, অন্তরায় বাধা কেটে যায়, নেতিবাচক প্রভাব (কুদৃষ্টি, অশুভ সংকেত) হ্রাস পায়, মন সংযত হয়; পশুভাব দমন হয়, সাধনায় স্থিরতা আসে।
জপের সহজ নিয়ম :
সময়: রাত্রি বা ব্রাহ্মমুহূর্ত উত্তম
সংখ্যা: ১০৮ বার
প্রণাম মন্ত্র: ওঁ গুহ্যকালিকায়ৈ নমঃ
দেবী গুহ্যকালীর আরাধনা ১৮টি বিশেষ তান্ত্রিক যন্ত্রের মাধ্যমে করা হয়। সাধারণত শ্মশান বা নির্জন স্থানে মধ্যরাতে তাঁর পূজা সম্পন্ন হয়।
রাঢ় বাংলার বীরভূম জেলার রামপুরহাট থেকে প্রায় ২৫ কিমি এবং নলহাটি থেকে ৬ কিমি দূরে ভদ্রপুর গ্রামের কাছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এক প্রাচীন ঐতিহাসিক দেবী 'গুহ্যকালিকা' এবং তাঁর মন্দির অবস্থিত।
বিখ্যাত অষ্টভুজাকৃতি মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রখ্যাত ভদ্রপুরা রাজবাড়ির পুত্র মহারাজা নন্দকুমার ভুবর। এই বিখ্যাত 'কালীমূর্তি'র (দেবী কালীর মূর্তি) কাছে শিবের কোনো স্থান নেই। দেবীর শরীরে সাপ জড়িয়ে আছে।
কিংবদন্তী অনুসারে, 'সর্পবরণভূষ্ঠা' (সর্পাবৃত), 'সর্পসিনী', 'দিভুজা' (দুই হস্ত), নর-মুণ্ড-মল্লিনী (খুলি-হার-প্রতিমা) হলেন মগধরাজ জরাসন্ধের পূজিত প্রতিমা। পরবর্তীকালে, এটি কাশীর রাজা চেঠসিংহের প্রাসাদে স্থাপিত হয় এবং পূজিত হতে থাকে। ব্রিটিশ গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস রাজা চেঠসিংহের প্রাসাদ লুট করার সময় অন্যান্য অনেক জিনিসের সাথে এই প্রতিমাটিও লুট করে নেন। কলকাতা যাওয়ার পথে গঙ্গা নদী পার হওয়ার সময় দেওয়ান মহারাজ নন্দকুমার মূর্তিটি উদ্ধার করেন। তারপর তিনি অখিলিপুরে ব্রাহ্মণ নদীর তীরে একটি বটগাছের পাশে (যা এখনও বিদ্যমান) এই দেবীর পূজা করার সিদ্ধান্ত নেন।
কিংবদন্তী অনুসারে, নন্দকুমারের 'কুলপুরোহিত' এই মন্দির প্রতিষ্ঠায় আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন যে কোনও গৃহস্থের পক্ষে এই বিগ্রহের পূজা করা সম্ভব নয়। কেবল একজন 'কুলপালিক' বা 'তান্ত্রিক'ই এই অধিকার লাভ করতে পারেন। মহারাজ সেই আপত্তি অগ্রাহ্য করে মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তা সম্পন্ন হয়নি। বজ্রঝড়ে মন্দিরের কোণগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চূড়াটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তারপর মহারাজ '১১৭৮' শকাব্দের '১১ই মাঘ' তিথিতে অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে অসম্পূর্ণ মন্দিরটি সম্পূর্ণ করেন এবং সেখানে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন।
ব্রিটিশ সরকার ওয়ারেন হেস্টিংসকে পদচ্যুত করে এবং এরপর মহারাজা নন্দকুমার বীরভূম, বর্ধমান, নদিয়া ও হুগলির দেওয়ান নিযুক্ত হন । সেই সূত্রে জানা যায়, হেস্টিংস অনেক বিষয়েই আগ্রহী ছিলেন। নন্দকুমার হেস্টিংস দ্বারা সংঘটিত বিভিন্ন লুটপাট ও আর্থিক দুর্নীতির ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন। হেস্টিংস অর্থের লোভ দেখিয়ে মহারাজাকে নিরস্ত করতে চেয়েছিলেন , কিন্তু মহারাজা এই কার্যকলাপের বিষয়ে সরকারের কাছে অভিযোগ করেন।
হেস্টিংস এই ব্যাপারটা সহজে মেনে নেননি। হেস্টিংসের মিথ্যা মামলার ষড়যন্ত্রে মহারাজ নন্দকুমার অভিযুক্ত হয়েছিলেন। নন্দকুমারকে ফাঁসি দেন বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্ফে, যিনি হেস্টিংসের শৈশবের বন্ধু ছিলেন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কাহিনী সকলেরই জানা।