

একদল আছে, যারা নিজের রুচির উপর ধর্মের স্থাপন করতে চায়। এটা আমার ষষ্ঠ পোস্ট। ভালো লাগলে শেয়ার করবেন।
শাস্ত্রীয় প্রমাণ কিছু দেওয়া যাক, যারা বলে আমিষ এবং মাছমাংস আহার নিষিদ্ধ।
আশাকরি সবাই মিলিয়ে দেখবেন।
(মহাভারত থেকে দৃষ্টান্ত সমূহ)
[১] কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত মহাভারতের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র গুলোর মধ্যে অন্যতম হল যুধিষ্ঠির, যিনি একদিকে সুদক্ষ রাজা অপর দিকে সত্যবাদী এবং ধর্ম জ্ঞানী। ইনিও কিন্তু বনবাস কালে ফলমূল ও মাংস খেয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন।
———————————-
[ বনপর্ব, আরণ্যকপর্বাধ্যায়]
[২] এখানেই শেষ নয়, বনবাস কালে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে ছিলো বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণগণ। তাদের পোষন করার জন্য যুধিষ্ঠি সূর্যদেবের তপস্যা করেছিলেন এবং একটি তামার স্থালী বর স্বরূপ প্রাপ্ত করেছিলো যাতে আমিষ নিরামিষ সব খাবারই অক্ষয় হয়ে থাকে।
———————————-
[ বনপর্ব, আরণ্যকপর্বাধ্যায়]
[৩] আরো আছে! যুধিষ্ঠির ও তার ভ্রাতাগণ মিলে দ্বৈতবনের অধিকাংশ হরিণ শিকার করে আহার করে নিয়েছিলেন, পরে পশুদের প্রার্থনা শুনে কাম্যকবনে গমন করেন এবং এক বছর আটমাস হরিণের মাংসভোজী হয়ে থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
———————————-
[বনপর্ব, মৃগস্বপ্নোদ্ভব ও ব্রীহিদ্রৌণিক পর্বাধ্যায়]
[৪] যুধিষ্ঠির আবার এর আগে দশ হাজার ব্রাহ্মণ কে ঘৃত মধু মিশ্রিত পায়স, ফলমূল, বরাহ ও হরিণের মাংস, তিল মিশ্রিত অন্ন প্রভৃতি বিবিধ ভোজ্য দিয়ে তুষ্টি করেছিলেন।
———————————
[সভাপর্ব, সভাক্রিয়াপর্বাধ্যায়]
[৫] এটা তো যুধিষ্ঠিরের প্রাণীজ খাবারের আহারের দৃষ্টান্ত গেলো। এখন আরেক বেদজ্ঞ ও সত্যবাদী রাজা নলের মাংস রান্নার দৃষ্টান্ত দেখুন –
———————————-
[বনপর্ব, নল-দময়ন্তীর পুনর্মিলন অধ্যায়]
তাহলে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস কৃত মহাভারতেও প্রাণীজ আহার গ্রহণের দৃষ্টান্ত পাওয়া গেলো।
(আয়ুর্বেদ গ্রন্থসমূহ থেকে দৃষ্টান্ত)
বেদ, বিধি বিধান প্রণেত স্মৃতিশাস্ত্র, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত থেকে প্রাণীজ খাবার ভোজনের দৃষ্টান্ত আগেই তুলে ধরেছি। এখন উপবেদ আয়ুর্বেদের অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থচরক সংহিতার কিছু প্রাণীজ আহার ভোজনের দৃষ্টান্ত দেখুন :-
[৬] ডিমের উপকারীতা
চরক সংহিতা ২৭.৮৭
———————————-
[৭] সুস্থ ও আয়ুবর্ধক হিসাবে মিশ্র খাবারের গুরুত্ব
চরক সংহিতা ১৬.২২-২৩
———————————-
[৮] চিকিৎসার কাজে মাছ ও মাংসের ব্যাবহার
চরক সংহিতা ৩.১৯ ও ৫.৫
———————————-
[৯] ঋতু ভিত্তিক লাইফস্টাইলে প্রাণীজ খাবারের গুরুত্ব
চরক সংহিতা ৭.৪১-৪৮ ও ৬.২৭-৩২
এরসঙ্গে প্রাচীন আয়ুর্বেদের অন্যতম গ্রন্থ, বাগভট মুনির অষ্টাঙ্গহৃদয় সূত্রস্থান থেকে প্রাণীজ খাবার ভোজনের উপকারীতার কিছু দৃষ্টান্ত সমূহ দেখুন :-
[১০] মাংস, পেশীজ চর্বি ও অস্থি মজ্জাগত চর্বির উপকারীতা
অষ্টাঙ্গহৃদয় সূত্রস্থান ৫.৬৩
———————————-
[১১] মাংসের স্যুপ এর উপকারীতা
অষ্টাঙ্গহৃদয় সূত্রস্থান ৬.৩২
———————————-
[১২] ব্রহ্ম পুরাণ ৭৯.২১ তে গোবর্ধন পাহাড়ের পূজো, পশু উৎসর্গের মাধ্যমে হওয়ার উল্লেখ মেলে।
এখানে উল্লেখ্য যে পৌরাণিক কাহিনী মতে গোবর্ধন পাহাড়ের পূজো করার পরামর্শশ্রীকৃষ্ণ নিজেই দিয়েছিলেন বৃন্দাবনবাসীদের।
———————————-
[১৩] অগ্নি পুরাণ ১৬৮.২১ তে বৈধ প্রাণীজ খাবারের বর্ণনা করতে গিয়ে স্পস্ট উল্লেখ করা হয়েছে কি কি প্রকৃতির মাছ ও মাংস খাওয়া যাবে।
———————————-
[১৪] বায়ু পুরাণ ২.১৯.৩-৪ তে উল্লেখ আছে দ্বিতীয় অষ্টক (অনুষ্ঠান) মাংস নিবেদন করেই পালন করা উচিত।
———————————-
[১৫] অগ্নি পুরাণ ৮৪.১ তে বন্ধনমুক্তি অনুষ্ঠানের নিয়মে মাংস খাওয়ার উল্লেখ করা হয়েছে।
———————————-
[১৬] অগ্নি পুরাণ ৪০.৪ তে উল্লেখ আছে গগনের অধিপতি অর্ধ চতুঃকৌণিক ভাবে অধিষ্ঠিত, যিনি তৃপ্ত হন পাখির মাংস দ্বারা।
———————————-
[১৭] অগ্নি পুরাণ ৪০.৬ তে উল্লেখ আছে ধর্মের অধিপতি দ্বি-চতুষ্ক ভাবে অধিষ্ঠিত, যিনি পূজিত হন মাংস ও রন্ধন করা খাবার দ্বারা।
———————————-
[১৮] গরুড় পুরাণ ১৬৯.৬২ তে উল্লেখ করা হয়েছে খাদ্যের সাথে রন্ধন করা মাংস হল আয়ুর্বর্ধক।
———————————-
[১৯] হরিবংশ পুরাণ ২.১৭.১৭-২১ তেও এই গোবর্ধন পাহাড় পূজোর বিবরণ আছে এবং শ্রীকৃষ্ণর দ্বারা গোবর্ধন পাহাড় রূপে সেইসব নিবেদিত বস্তুর (আমিষ) আহারের কথাও উল্লেখ আছে।
———————————-
[২০] অনেকে আবার দোহাই দেয় কলিযুগে প্রাণীজ খাবার খাওয়া নিষিদ্ধ! যদিও বিভিন্ন পুরাণে বর্ণিত যুগধর্মের বর্ণনাতে এই মন্তব্যটিকোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে কলিযুগের যে কল্কি অবতারের কথা উল্লেখ আছে, তার দ্বারা ব্রাহ্মণ ভোজনের মেনুকার্ড টি একবার দেখবেন না?
কল্কি উপ-পুরাণ ৩০.১০-১৩
তাহলে পুরাণেও প্রাণীজ খাবার গ্রহণের দৃষ্টান্ত পাওয়া গেলো।
———————————-
(রামায়ণ থেকে দৃষ্টান্ত)
বাল্মীকি মুনি তার রামায়ণে শ্রীরাম কে আর্যশ্রেষ্ঠ ও আর্যপুত্র হিসাবে বহুবার আখ্যায়িত করেছেন, এর সঙ্গে এই রামায়ণে শ্রীরাম দ্বারা পশু শিকার, মাতা সীতাকে খাবার জন্য মাংস নিবেদন ও লক্ষ্মণ দ্বারা মাংস রান্নার বিবরণও উল্লেখ করেছেন।
———————————-
[২১] বাল্মীকি রামায়ণ ২.৫২.১০২ অনুসারে ক্ষুধাকাতর রাম ও লক্ষ্মণ একটি বন্যশূকর, একটি সাদা পা ওয়াল পুরুষ কৃষ্ণসার, একটি ছোপ ছোপ দাগ বিশিষ্ট হরিণ এবং কালছে ফিতার ন্যায় দাগ বিশিষ্ট একটি বিরাট হরিণ শিকার করেছিলেন।
———————————-
[২২] বাল্মীকি রামায়ণ ২.৯৬.১-২ অনুসারে শ্রীরাম মাতা সীতাকে খাবার জন্য মাংস নিবেদন করেছিলেন।
———————————-
[২৩] বাল্মীকি রামায়ণ ৩.৪৭.২২-২৩ অনুসারে মাতা সীতা ব্রাহ্মণ বেশে ছদ্মবেশী রাবণ কে বলছেন “আপনি এখানে বিশ্রাম করুন, আমার স্বামী বন থেকে বিভিন্ন রকমের হরিণ, গোধাঃ, বন্য শূকর শিকার করে নিয়ে আসবেন”
———————————-
[২৪] বাল্মীকি রামায়ণ ২.৫৬.২৬-২৭ অনুসারে নিবেদনের উদ্দেশ্যে লক্ষ্মণ দ্বারা কৃষ্ণসার শিকার ও মাংস রান্নার উল্লেখ আছে।
তাহলে বাল্মীকি রামায়ণে প্রাণীজ খাবার গ্রহণের দৃষ্টান্ত পাওয়া গেলো।
———————————-
[২৫] ঋগ্বেদের শাঙ্খায়ন গৃহসূত্র ১.২৭.১-৬ তে অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠানে মাছ ও মাংস খাওয়ানোর উল্লেখ আছে।
———————————-
[২৬] অনুরূপ দৃষ্টান্ত শুক্ল যর্জুবেদের পারস্কর গৃহসূত্র ১.১৯.৭-১৩ তে পাওয়া যায়, যেখানে অন্নপ্রাশনে পাখির মাংস ও মাছ খাওয়ানোর উল্লেখ আছে।
———————————-
[২৭] সামবেদের গোভিলী গৃহসূত্র ৩.১০.১-৬ তে অষ্টকে (একটি শীতকালীন বৈদিক অনুষ্ঠান) মাংস নিবেদনের মাধ্যমে পালন করার উল্লেখ আছে।
———————————-
[২৮] কৃষ্ণ যর্জুবেদের আপস্তম্ব ধর্মসূত্রের২.১০.২৫.৮-১০ তে উল্লেখ করা হয়েছে – বাড়িতে বেদজ্ঞ অতিথি এলে, তাকে তার গুণমান অনুসারে থাকার ঘরের সাথে সাথে মাংস এবং পানীয় নিবেদন করতে।
———————————-
[২৯] বশিষ্ট ধর্মসূত্র ১৪.৪৮ তে কোন কোন পাখির মাংস খাওয়া যায় না, তার উল্লেখ আছে।
———————————-
[৩২] শতপথ ব্রাহ্মণে ১১.৭.১.৩ তে উৎসর্গীকৃত মাংস কে একটি ভালো খাবার হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
———————————-
[৩৩]যজ্ঞে উৎসর্গীকৃত পশুর ব্যাপারেরামানুজাচার্য ভগবত গীতার ২.৩২ ভাষ্যতে উল্লেখ করেছেন উৎসর্গীকৃত পশু সমূহ পরজন্মে একটি ভালো জীবন প্রাপ্ত করে।
———————————-
[৩৪]এছাড়া ব্রহ্মসূত্রের ৩.১.২৫ তে উল্লেখ আছে”যজ্ঞে পশুবধ করে জীব অশুদ্ধ হয় না, ইহা শাস্ত্রেই উল্লেখ আছে”।
অতএব শাস্ত্র দেখে আপনারাই সিন্ধাত্ব নিন।
ধন্যবাদ।
——- জয় পরমেশ্বর শিবশম্ভু”
ঠাকুর শ্রী সুজন আচার্য্য
(ষষ্ঠতীর্থ -ঢাকা)
সাংগঠনিক সম্পাদক
শ্রীহট্র ব্রাহ্মণ পরিষদ আজমিরীগজ্ঞ উপজেলা









