গুপ্তেশ্বর মহাদেব মন্দির

দেবাশীষ কুন্ডু

ঘন জঙ্গল আর সুউচ্চ পাহাড়ে ঘেরা মধ্যপ্রদেশের বুরহানপুরের এক নির্জন পর্বতচূড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ৫০০০ বছরের প্রাচীন ‘আসিরগড় দুর্গ’ (Asirgarh Fort)। ইতিহাসবিদদের কাছে এটি ‘দাক্ষিণাত্যের চাবি’ নামে পরিচিত হলেও, স্থানীয় মানুষ ও গবেষকদের কাছে এটি এক চরম অলৌকিক রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু! ঐতিহাসিক
সাতপুরা পর্বতমালায় অবস্থিত আসিরগড় দুর্গ তার কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে “ভারতের জিব্রাল্টার” নামেও পরিচিত। এর নির্মাণ সম্পর্কিত তথ্য ও নথিপত্র নিয়ে দুর্গটিকে ঘিরে এক অনিশ্চয়তার আবরণ রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, দুর্গটি আসা আহির নামক এক পশুপালক নির্মাণ করেছিলেন এবং পরে ফারুকী শাসকেরা এটিকে আরও শক্তিশালী করেন। তবে, এখানে অবস্থিত শিব মন্দিরের সাথে সম্পর্কিত কিংবদন্তিগুলো এই দুর্গটিকে মহাকাব্য মহাভারতের সময়কালের সাথে যুক্ত করে। বিশ্বাস করা হয় যে, অশ্বত্থামা (মহাভারতে উল্লিখিত একটি চরিত্র) এখানে ভগবান শিবের পূজা করতে এসেছিলেন।

মুঘল স্থাপত্যের এক সুন্দর নিদর্শন আসিরগড় দুর্গটি কারুকার্য ও নকশার এক বিস্ময়। এই দুর্গ পরিদর্শনে গেলে মনে হয় যেন সেই যুগের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে দিয়ে ভ্রমণ করা হচ্ছে। এই দুর্গে চৌহান, ফারুকী এবং পরাক্রমশালী মুঘলদের মতো বিভিন্ন রাজবংশের শাসকদের দ্বারা নির্মিত স্থাপত্য রয়েছে, যারা আসিরগড়ে হয় আক্রমণ করেছিল অথবা শাসন করেছিল। আসিরগড়ের গৌরবময় অতীত ইতিহাসের অনেক আকর্ষণীয় গল্পের সাক্ষী। দুর্গটি সম্পর্কে একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হলো, এটি কখনও সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করা হয়নি, বরং সর্বদা কৌশলগত পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র বা প্রতারণার মাধ্যমে দখল করা হয়েছে। এমনকি মহান সম্রাট আকবরকেও দুর্গটির নিয়ন্ত্রণ পেতে সতর্ক পরিকল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

ভগবান শিবকে উৎসর্গীকৃত গুপ্তেশ্বর মহাদেব মন্দিরটি প্রাচীন দক্ষিণ ভারতীয় মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এবং এটি একটি প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। কালো পাথরে নির্মিত জামা মসজিদটি মুঘল যুগের জাঁকজমককে ধারণ করে আছে। দুর্গের অভ্যন্তরে মন্দির এবং মসজিদ উভয়ের উপস্থিতি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এর ধর্মীয় তাৎপর্যকে তুলে ধরে।

আসিরগড় দুর্গটি তিনটি স্তরে সুরক্ষিত: মলয়গড়, কামারগড় এবং দুর্ভেদ্য আসিরগড়। দর্শনার্থীরা সিঁড়ি বেয়ে চূড়ায় পৌঁছাতে পারেন, অন্যদিকে রোমাঞ্চপ্রেমীরা উত্তেজনা ও রোমাঞ্চে ভরপুর আরও কঠিন একটি পথ বেছে নিতে পারেন। চূড়া থেকে দৃশ্যটি মনোমুগ্ধকর, যা দেখে মনে হয় যেন অতীত থেকে ইতিহাস উঠে এসে এখানে একসময় শাসন করে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া মহান রাজবংশগুলোর গৌরবময় কাহিনী বর্ণনা করছে, যারা রেখে গেছে অমর স্মৃতি।

বিশ্বাস করা হয়—এই দুর্গের চূড়ায় থাকা প্রাচীন শিব মন্দিরে মহাভারতের সেই অমর চরিত্র গুরু দ্রোণাচার্যের পুত্র অশ্বত্থামা আজও কায়িক বা সূক্ষ্ম শরীরে ঘুরে বেড়ান!

বন্ধ দরজার পেছনের অলৌকিক রহস্য:
দুর্গের প্রাঙ্গণে অবস্থিত প্রাচীন শিব মন্দিরটি রাতে সম্পূর্ণ জনমানবহীন ও নির্জন থাকে। নিরাপত্তা ও সুরক্ষার কারণে মন্দিরের মূল দরজা রাতে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিদিন ভোরে যখন পূজারী বা স্থানীয় দর্শনার্থীরা মন্দিরের দরজা খোলেন, তখন সেখানে অপেক্ষা করে এক পরম বিস্ময়!

প্রতিদিন সকালে শিবলিঙ্গের ওপর দেখা যায় তাজা রক্তগোলাপ বা বেলপাতা এবং তাজা চন্দনের প্রলেপ!

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো—দুর্গের আশেপাশের মাইলের পর মাইল এলাকায় কোনো গোলাপের বাগান নেই। অথচ প্রতিদিন ভোরে অতি নিখুঁতভাবে এই তাজা গোলাপ শিবলিঙ্গে চড়ানো অবস্থায় পাওয়া যায়।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সেই অভিশাপের চিহ্ন হিসেবে, শিবলিঙ্গের পাশে নাকি মাঝেমধ্যে কোনো ক্ষত থেকে ভেসে আসা তাজা রক্তের ফোঁটাও প্রত্যক্ষ করেছেন অনেকে!

কে এই অশ্বত্থামা? কেন এই অমরত্বের শাস্তি?
মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অন্তিম লগ্নে পরম অধর্মের আশ্রয় নিয়ে পাণ্ডবদের নিদ্রিত পুত্রদের হত্যা করেছিলেন অশ্বত্থামা। এরপর অর্জুনের বাণ নিষ্ক্রিয় করতে তিনি মহা শক্তিশালী ‘ব্রহ্মশিরা’ বাণ প্রয়োগ করেন এবং তা উত্তরা-র গর্ভে থাকা অভিমন্যুর সন্তানের দিকে চালিত করেন।

এই চরম অন্যায়ের শাস্তিস্বরূপ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অশ্বত্থামার কপাল থেকে পরম তেজস্বী ‘মণি’ উপড়ে নেন এবং অভিশাপ দেন:

“তুমি কলিযুগের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত কপালে যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত নিয়ে এই পৃথিবীতে একা, নির্বান্ধব অবস্থায় ঘুরে বেড়াবে। মৃত্যুও তোমাকে স্পর্শ করবে না!”

আধুনিক গবেষণা ও মানুষের অভিজ্ঞতা:
বহু স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটক দাবি করেছেন যে, ভোরের কুয়াশায় বা রাতে দুর্গের পুকুরের (আশা পুকুর) জলে দীর্ঘদেহী কোনো এক বিষণ্ণ মানুষকে স্নান করতে ও শিব মন্দিরের দিকে হেঁটে যেতে দেখা যায়। অনেকে এমনকি প্যারানরমাল সরঞ্জাম ও ক্যামেরা নিয়ে রাতে পরীক্ষা করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু রহস্যের শেষ সীমানা পর্যন্ত কেউ পৌঁছাতে পারেননি।

বিজ্ঞান বা আধুনিক যুক্তি একে স্থানীয় লোকবিশ্বাস বললেও, ৫০০০ বছর ধরে প্রতিদিন বন্ধ দরজার ভেতরে তাজা গোলাপ চড়ে যাওয়ার এই অলৌকিক ঘটনা আসিরগড় দুর্গকে এক জীবন্ত রহস্যে পরিণত করেছে।

মন্তব্য করুন