
স্বামী দিব্যানন্দ
দেবী দুর্গার উদ্ভব নিয়ে দুটি উপাখ্যান প্রচলিত আছে। একটি পদ্মপুরাণের। সেখানে আছে রাত্রিদেবী ব্রহ্মার অনুরোধে হিমালয়পত্নী মেনকার গর্ভে প্রবেশ করে উমার গায়ের রং কৃষ্ণবর্ণে পরিণত করেন—যা থেকে অনুমিত হয় বৈদিক দেবী রাত্রিই পৌরাণিক পার্বতীরূপে পূজিতা হয়েছেন। দ্বিতীয় উপাখ্যানটি মার্কণ্ডেয়পুরাণের দেবীমাহাত্ম্যে আছে, এটিই অধিক প্রচলিত। ব্রহ্মার বরে মহিষাসুর পুরুষের দ্বারা অবধ্য হওয়ায় বিষ্ণু দেবতাদের আশ্বাসবাণী প্রদান করে বলেছিলেন,
সকল দেবতার তেজ থেকে উৎপন্ন শক্তি সম্মিলিত হয়ে এক দেবীর রূপ পরিগ্রহ করবে। তিনিই মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা।
এ তো গেল দুর্গার উৎসকথা। কিন্তু দুর্গাপূজার উদ্ভব কীভাবে? আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির মতে—দুর্গাপূজা বৈদিক রুদ্রযজ্ঞের পরিবর্তিত রূপ। রুদ্রযজ্ঞের অগ্নিই দুর্গা। অন্যমতে বৈদিক যুগে শরৎকালেই নতুন বছর গণনা আরম্ভ হত এবং অনুমিত হয় যে এই নতুন বছরে রুদ্রযজ্ঞ সম্পন্ন হত। তাই রুদ্রযজ্ঞের বিবর্তিত রূপ দেবীপূজা শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয়। আবার অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের মতে দুর্গাপূজা আসলে প্রাচীন শারদোৎসব। অম্বিকা দেবীর নাম দুর্গা। অম্বিকা বলতে শরৎ ঋতুও বোঝায়। তিনি তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ থেকে প্রমাণ উদ্ধার করে দেখিয়েছেন যে শরৎ ঋতুর পূজা করার অর্থই দেবী অম্বিকার পূজা অর্থাৎ দুর্গাপূজা করা। ‘পূজা’ তন্ত্রের অবদান, বৈদিক যুগে প্রচলিত ছিল না এবং সর্বপ্রথম দুর্গাপূজার উল্লেখ রয়েছে বিভিন্ন পুরাণে—তাই পৌরাণিক যুগেই এর উদ্ভব। হয়তো বৈদিক যুগে যে-শক্তির উন্মেষ, পুরাণের যুগে তার বিকাশ এবং সেই পূজার বিশেষ নিয়মকানুন রচিত হয়েছিল মধ্যযুগের বিখ্যাত পণ্ডিতদের প্রতিভায়। দুর্গাপূজার তত্ত্বগত ও প্রণালীগত দিক নিয়ে যাঁরা আলোচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন বলে চিহ্নিত বালক নামে এক স্মার্ত বাঙালি পণ্ডিত। তাঁর সমসাময়িক অপর একজন তাত্ত্বিক হলেন জীবন। ভবদেব ভট্ট ও শ্রীকর দত্ত এঁদের পরবর্তী তত্ত্বকার। কিন্তু বাংলার নব্য স্মৃতি যাঁর প্রতিভায় উদ্ভাসিত, যাঁর নির্দেশিত পূজা-পদ্ধতি অনুসারেই বর্তমান অধিকাংশ পূজার প্রচলন—তিনি হলেন বিখ্যাত স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন। তিনি শ্রীচৈতন্যদেবের সমসাময়িক। দুর্গাপূজাসংক্রান্ত তাঁর তিনটি গ্রন্থ পাওয়া যায়—দুর্গোৎসবতত্ত্ব, দুর্গাপূজাতত্ত্ব ও কৃত্যতত্ত্ব।
রঘুনন্দনের গ্রন্থে তন্ত্র ও পুরাণের প্রভাব ও উল্লেখ খুব বেশি দেখা যায়। তাঁর পূর্বেই তন্ত্র-পুরাণ অনুসারী পূজা প্রচলিত ছিল। সেই তান্ত্রিক আচার-অনুষ্ঠানের অনেকখানিই পূজার অঙ্গ হিসেবে রঘুনন্দন গ্রহণ করেছিলেন।
রঘুনন্দন স্মৃতিতে দুর্গোৎসবের ছয়টি কল্পের বিধান আছে—কৃষ্ণনবম্যাদি কল্প, প্রতিপদাদি কল্প, ষষ্ঠ্যাদি কল্প, সপ্তম্যাদি কল্প, মহাষ্টম্যাদি কল্প, মহানবমীকল্প। কেউ কেউ এর অতিরিক্ত মহাষ্টমীকল্প অর্থাৎ সর্বমোট সাতটি কল্প স্বীকার করেন। এর মধ্যে বঙ্গদেশ, বিহার ও আসাম অঞ্চলে ষষ্ঠ্যাদি কল্প প্রচলিত। এই কল্প অনুসারে ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যাকালে বিল্ববৃক্ষের শাখায় দেবীর বোধন হয়। তারপরে আমন্ত্রণ ও অধিবাস। ওইদিনকার পূজা হয় ঘটে। পরে সপ্তমী থেকে তিনদিন মৃণ্ময়ী প্রতিমায় পূজা। কৃষ্ণনবম্যাদি কল্পে ও প্রতিপদাদি কল্পে যথাক্রমে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণানবমীতে ও আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদে দেবীর বোধন হয়। প্রথমকল্পে পক্ষব্যাপী ও দ্বিতীয় কল্পে নবরাত্রি মায়ের অর্চনা হয়ে থাকে। ষষ্ঠ্যাদি কল্পে চারদিন পূজা হয়। অনুরূপভাবে সপ্তম্যাদি, অষ্টম্যাদিকল্পে যথাক্রমে সপ্তমী থেকে তিনদিন ও অষ্টমী থেকে দুইদিন পূজা করে দশমীতে বিসর্জন হয়। অষ্টমী ও নবমীকল্প কেবলমাত্র একদিনেরই—উক্ত তিথিতে পূজা ও বিসর্জন। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য। বর্তমানকালে সংবাদপত্র প্রভৃতির প্রভাবে আমরা অজ্ঞতাবশত সব তিথির পূর্বেই ‘মহা’ বিশেষণটি যোগ করে থাকি, যথা — মহাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী ইত্যাদি। কিন্তু এ-হেন ব্যবহার শাস্ত্রানুমোদিত নয়। কেবলমাত্র অষ্টমী ও নবমীই এই অভিধা পেতে পারে। শাস্ত্রে আছে—“মহাবিপত্তারকত্বাদ্ গীয়তেঽসৌ মহাষ্টমী।/ মহাসম্পদ্দায়কত্বাৎ সা মহানবমী মতা৷৷” মহাশক্তির আবির্ভাবে শ্রীরামচন্দ্র রাবণকে বধ করে সীতা দেবীর উদ্ধার সাধন করেন।
মহাবিপদ কেটে গেল বলে অষ্টমীর নাম হল মহাষ্টমী। মহাসম্পদ লাভ হল বলে নবমী হল মহানবমী।
কবি কৃত্তিবাস তাঁর রামায়ণে লিখেছেন— ‘অকালে শরতে কৈল চণ্ডীর বোধন।’ তিনি একশো আট নীল পদ্ম দিয়ে রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন : “সায়াহ্ন কালেতে করিল বোধন।/ আমন্ত্রণ অভয়ার বিল্বাধিবাসন।” এই শারদীয়া দুর্গোৎসবকে অকালবোধন বলা হয়। বোধন কথার অর্থ জাগরণ। জাগরণের প্রয়োজন হয় নিদ্রিত থাকলে এবং রাত্রিকালে নিদ্রা থেকে জাগরণ যদি হয় তাহলে তা অকালের জাগরণ। আমাদের ছ-মাসে দেবতাদের একদিন এবং ছ-মাসে এক রাত। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ছ-মাসকে উত্তরায়ণ এবং শ্রাবণ থেকে পৌষ পর্যন্ত ছ-মাসকে দক্ষিণায়ন বলা হয়। উত্তরায়ণ দেবতাদের একদিন ও দক্ষিণায়ন দেবতাদের একরাত্রি; তাই শরৎকাল দক্ষিণায়নের অন্তর্গত, সেইসময় দেবতারা নিদ্রিত থাকেন। এ- কারণে শারদীয়া পূজায় দেবীর জাগরণের জন্য বোধনের প্রয়োজন হয়। শরৎকালে দেবীকে বোধনের দ্বারা জাগাতে হয় বলে তাঁর অপর নাম ‘শারদা’। বসন্ত ঋতু উত্তরায়ণে; তখন দেবতাদের দিন। তাই বাসন্তীপূজায় কোনও বোধন করতে হয় না। রাবণ এ-সময়ে মায়ের পূজা করেছিলেন; আবার ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে আছে রাজা সুরথ ও মধুমাসে দেবীর অর্চনা করেছিলেন। কিন্তু কালিকাপুরাণে বলা হয়েছে ব্রহ্মা রাত্রি দেবীর বোধন করেছিলেন। দেবীভাগবতে বোধনের কোনও উল্লেখ নেই। দেবর্ষি নারদের পৌরোহিত্যে রামচন্দ্র নবরাত্র ব্রতের উদযাপন করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে রামচন্দ্র বা ব্রহ্মার শরৎকালীন পূজা অকাল পূজা হলেও কালক্রমে সেটিই বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করে। উক্ত পূজার বোধনমন্ত্রে আছে—“ঐং রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ।/
অকালে ব্রহ্মণা বোধো দেব্যাস্ত্বয়ি কৃতঃ পুরা ।” (হে দেবী, রাবণ বধের উদ্দেশ্যে এবং রামচন্দ্রকে অনুগৃহীত করবার জন্য পুরাকালে ব্রহ্মা অকালে তোমার বোধন করেছিলেন)।
গণেশের বউ বা কলাবউ নামে সাধারণের কাছে যা পরিচিত, তা আসলে নবপত্রিকা। কলাগাছ, কালো কচুগাছ, হলুদগাছ, জয়ন্তীগাছের শাখা, বেল, ডালিম, অশোক ডাল, মানকচু ও ধানের শিষ—এই নয়টিকে শ্বেত অপরাজিতার লতা ও হলুদ রঙের সুতো দিয়ে বেঁধে নবপত্রিকার পূজা করা হয়। পণ্ডিতদের মতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের কৃষিভিত্তিক সমাজে শস্য উৎপাদনের জন্য পৃথ্বীদেবীর পূজা যে প্রচলিত ছিল, তারই স্মৃতি বহন করে এটি। নবপত্রিকা পূজা আসলে প্রতীকোপাসনা। এর প্রতিটি উদ্ভিদ দেবীর এক একটি প্রতীক। এই নয়টি চারার মধ্যে আছেন কলার অধিষ্ঠাত্রী—ব্রহ্মাণী, কচুর—কালী, হলুদের—দুর্গা, জয়ন্তীর—কার্তিকী, বেলের—শিবা, ডালিমের— রক্তদন্তিকা, অশোকের শোকরহিতা, মানকচুর— চামুণ্ডা ও ধানের—লক্ষ্মী। সমবেতভাবে নব- পত্রিকার অধিষ্ঠাত্রী দেবী দুর্গা। কালিকাপুরাণ ও মার্কণ্ডেয়পুরাণে নবপত্রিকার উল্লেখ দেখা যায় না। নবপত্রিকা পূজাবিধি পরবর্তী কালের।
দুর্গাপূজার অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে যে-পূজা অনুষ্ঠিত হয় তাকে আমরা সন্ধিপূজা বলি । অষ্টমীর শেষ চব্বিশ মিনিট এবং নবমীর প্রথম চব্বিশ মিনিট—মোট আটচল্লিশ মিনিটের মধ্যে এই পূজা সমাপন করতে হয়। পুরাণে আছে অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমুণ্ড ছিন্ন করেছিলেন রামচন্দ্র (পাওয়ামাস দশ বৈ মস্তকান্ কালসন্ধিকে)। সন্ধিপূজার মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে আরও বলা হয়—“অষ্টমীনবমীসন্ধিকালোয় বৎসরাত্মকঃ।/ তত্রৈব নবমী ভাগঃ কালঃ কল্পাত্মকো মম ৷৷” (বৃহদ্ধর্মপুরাণ)—অষ্টমী-নবমীর
সন্ধিকালের পূজা এক বছরের তুল্য। অর্থাৎ দেবীর বর্ষব্যাপী পূজায় যে-ফল হয়, সন্ধির অষ্টমীভাগে একবার পূজা করলে সে-ফলের তুল্য ফল হয়। আর কল্পকাল পূজা করলে যে-ফল হয় সন্ধির নবমীভাগে পূজা করলে সে ফল হয়। সন্ধিপূজায় দেবীর আবির্ভাব হয় চামুণ্ডারূপে। দেবীকে দীপমালা প্রদান এই পূজার অন্যতম অঙ্গ।
দুর্গাপূজার অন্যতম বৈশিষ্ট্য কুমারীপূজা। দেবীপুরাণে এই পূজার সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে— পূজয়েৎ ব্রাহ্মণাঞ্ছক্র কন্যাং বালাং তথৈব চ”— দেবীপূজার অঙ্গ হিসেবে ব্রাহ্মণ ও কুমারীগণের যথাবিহিত পূজা করবে। কুমারীপূজার মাহাত্ম্যকীর্তনে তন্ত্র পঞ্চমুখ। সেখানে বলা হয়েছে, কুমারীপূজা ছাড়া হোম প্রভৃতি কর্ম পরিপূর্ণ ফল প্রদান করে না, কুমারীকে পুষ্পদানে সুমেরু পরিমাণ ফল লাভ হয়, কুমারীকে ভোজন করালে ত্রিলোকবাসীকে ভোজন করানো হয় ইত্যাদি। দুর্গাপূজার সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথির তিনদিন বা কোনও একদিন ষোলো বছরের কমবয়স্কা কোনও কুমারীকে দেবীজ্ঞানে পূজা করার রীতি আছে। বিভিন্ন বয়সের কন্যাকে বিভিন্ন নামে পূজা করা হয়। এক বছরের কন্যা সন্ধ্যা, দু বছরের সরস্বতী, তিন বছরের ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কালিকা, পাঁচ বছরের সুভগা, ছ বছরের উমা, সাত বছরের মালিনী, আট বছরের কুঞ্জিকা, ন বছরের কালসন্দর্ভা, দশ বছরের অপরাজিতা, এগারো বছরের রুদ্রাণী, বারো বছরের ভৈরবী, তেরো বছরের মহালক্ষ্মী, চোদ্দো বছরের পীঠনায়িকা, পনেরো বছরের ক্ষেত্রজ্ঞা ও ষোলো বছরের কুমারী অম্বিকা নামে পূজিতা হন। দেবীর কুমারী রূপ ও নাম বেদ-পুরাণের যুগ থেকে প্রচলিত। তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দেবীকে কুমারী নামে অভিহিত করা হয়েছে। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেও সেই পরমাত্মাকে স্ত্রী, পুরুষ, কুমার বা কুমারী বলা হয়েছে।
বৃহদ্ধর্মপুরাণে আছে দেবী অম্বিকা কুমারী কন্যারূপে ব্রহ্মাদি দেবতাদের সামনে আবির্ভূতা হয়ে দেবীর বোধন করতে নির্দেশ দেন। এককথায় এ-পূজার সহজ সরল ব্যাখ্যা হল সকল নারীকে ভগবতী বুদ্ধিতে দেখা; শুদ্ধাত্মা কুমারীতে যেহেতু ভাগবতী সত্তার বেশি প্রকাশ তাই কুমারীপূজা।
পূজাস্থলে দেবীর আগমন ঘটে এবং পূজ্য-পূজকের মিলনে সেটি হয়ে ওঠে একটি পুণ্যক্ষেত্র। তাই যে-কোনও পূজার মতোই দুর্গাপূজাতেও স্থানবিধি রয়েছে। দুর্গাপূজার ব্যবস্থা করার পক্ষে কোন কোন জায়গা অনুপযুক্ত বা অযোগ্য—তার নির্দেশ দিয়েছেন শূলপাণি । নিজের বসবাসের ঘর (বাড়ি নয়), বহু পুরানো স্থান, ইটের তৈরি জায়গা, দ্বীপ জ্বলে না । এমন স্থান দুর্গাপূজার পক্ষে অযোগ্য। কোন কোন স্থান পূজার যোগ্য সে-সম্বন্ধে তন্ত্রশাস্ত্রে বহু নির্দেশ আছে। বিল্বমূল, তুলসীকানন, দেবায়তন, গুরু সন্নিধান, যেখানে চিত্তের একাগ্রতা সহজে হয়,সর্বশেষে বলা হয়েছে : “সৰ্ব্বের্যামুত্তমং প্রোক্তং নির্জ্জনং পশুবর্জ্জিতম্।” আর একটি কৌতূহলের বিষয় হল দেবীর আগমন ও গমন। লোকপ্রচলিত বিশ্বাস যে দুর্গা স্বর্গ থেকে মর্ত্যে আসেন বিশেষ কোনও একটি যানে ও ফিরে যান আর একটি বাহনে। এই প্রত্যেকটি যানবাহনে যাত্রার ফল বা পরিণাম জ্যোতিষগণনায় নির্ধারিত আছে নিম্নোক্তভাবে : নৌকায় আগমন ও গমন—ফল শস্যবৃদ্ধি বা জলবৃদ্ধি। দোলায় আগমন -ও গমন—ফল মড়ক। গজে আগমন ও গমন— ফল শস্যপূর্ণা বসুন্ধরা। ঘোটকে আগমন ও গমন -ফল ছত্রভঙ্গ।
দেবীভাগবতে (৭।৩৯।৩) আছে : “দ্বিবিধা মম পূজা স্যাদ্বাহ্যা চাভ্যন্তরাপি চ।/ বাহ্যাপি দ্বিবিধা প্রোক্তা বৈদিকী তান্ত্রিকী তথা৷৷” দেবী বলছেন— আমার পূজা দুরকম—বাহ্য ও আভ্যন্তর। বাহ্যপূজা আবার দ্বিবিধ—বৈদিক ও তান্ত্রিক। এখন প্রশ্ন দুর্গাপূজা বৈদিক না তান্ত্রিক? পূর্বেই বলা হয়েছে পূজার ধারণাটি তন্ত্রের অবদান তাই অন্যান্য পূজার মতো দুর্গাপূজা তান্ত্রিক। আবার দেবী দুর্গা ও তাঁর পূজা পুরাণে বর্ণিত এবং পুরাণ বেদানুসারী, সেইদিক দিয়ে এই পূজাকে বৈদিকপূজাও বলা চলে। তবে এককথায় এ-পূজার কোনও শ্রেণীকরণ করতে গেলে বলতে হয়—এ হল ‘মহাপূজা’। মহাস্নান, পূজা, হোম ও বলিদান—এই চারটির সমন্বয়ে যে-পূজা সম্পন্ন হয় তা হল মহাপূজা। দেবীপুরাণে (২২।২৩) দুর্গাপূজাকে ‘অশ্বমেধ’ যজ্ঞের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ভক্তিসহকারে পূজা করলে অশ্বমেধযজ্ঞের সমান ফলপ্রাপ্তি ঘটে বলে একে ‘কলির অশ্বমেধ’ও বলা হয়। আবার প্রাচীন বেদান্তে স্বরূপ উপাসনা, সম্পদ উপাসনা ও প্রতীকোপাসনা—এই যে ত্রিবিধ উপাসনার কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে দুর্গার মূর্তিপূজা বা প্রতিমাপূজা ঠিক প্রতীকের পর্যায়ে পড়ে না। জনৈক সমালোচকের ভাষায়, “মায়ের পূজা সম্পদে প্রতীকে মিশ্রিত। দুর্গা বিশ্ব-মাতা, ‘জগতাং ধাত্রী’। দুর্গার মূর্তি ভাবময়ী মূর্তি, পূজাও ভাবের পূজা। ‘দুর্গোৎসব ভাবের অশ্বমেধ, রসের রাজসূয় ।”
তবু প্রশ্ন জাগে কেন এই পূজা? সাধারণভাবে এ-পূজার সার্থকতাই বা কী? উত্তরে মহানামব্রত ব্রহ্মচারীর ‘চণ্ডীচিন্তার’ অনুসরণে বলতে হয় পূজার দুটো দিক—একটি বাইরের দিক, সেটি বিজ্ঞানধর্মী, অপরটি অন্তরের দিক, সেটি আত্মধর্মী। বাইরের দিক থেকে পূজা একটি বিজ্ঞানসম্মত পন্থাবিশেষ। অন্তরের দিক থেকে পূজা একটি আত্মধর্মী প্রেমপূর্ণ সমর্পণবিশেষ। প্রথমটির উদ্দেশ্য মহাশক্তির সঙ্গে ব্যক্তিসত্তার সম্বন্ধ স্থাপন আর দ্বিতীয়টি যেন মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে-চিরসম্বন্ধ তারই পুনঃ প্রতিষ্ঠা। দেবীর অনুগ্রহে রামচন্দ্র রাবণকে বধ করে মহাবিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন এবং সীতারূপী মহাসম্পদ লাভ করেছিলেন। কিন্তু আমাদের তাতে কী? আমরা দেবীর বোধন ও পূজা করে কোন বিপদ থেকে উদ্ধার পাব আর কী মহাসম্পদই বা লাভ করব? উত্তরে বলা যেতে পারে—যিনি পূজক তিনি শ্রীরামের ভূমিকায়। সংসারাশ্রমী সাধারণ নরনারীর দারিদ্র্যই মহাবিপদ, ঐশ্বর্যই মহাসম্পদ, জীবনযাত্রাই যুদ্ধ। এই যুদ্ধে জয়লাভ করে মহাবিপদের হাত থেকে অব্যাহতি পেয়ে মহাসম্পদ লাভ মায়ের অনুগ্রহেই হয়ে থাকে, স্মরণীয় : ‘দারিদ্র্যদুঃখভয়হারিণী কা ত্বদন্যা’ (চণ্ডী ৪।১৭)। যাঁরা যোগী, সাধনই তাঁদের সমর, বিষয়বন্ধনই তাঁদের মহাবিপদ, মুক্তিলাভই মহাসম্পদ। জগজ্জননীর অৰ্চনায় যোগী সাধনসমরে জয়লাভ করেন, তাঁর ভববন্ধন ছিন্ন হয়। তিনি মুক্তি-সুখে ডুবে যান, স্মরণীয় : “যা মুক্তিহেতুরবিচিন্ত্যমহাব্রতা চ’ (চণ্ডী ৪।৯)। যাঁরা জ্ঞানমার্গের সাধক অজ্ঞানতাই তাঁদের মহাবিপদ, ব্রহ্মজ্ঞানই পরমধন। মহাদেবীর অর্চনায় সাধনযুদ্ধে তাঁরা জয়লাভ করেন, কারণ জগজ্জননী নিজেই মূর্ত ব্রহ্মজ্ঞানস্বরূপিণী। যাঁরা ভক্তিপথের উপাসক, তাঁদের ভক্তিরূপিণী সীতাদেবীকে চুরি করে নিয়ে গেছে অপরাধরূপী রাবণ—এই বেদনা তাঁদেরকে বেদনাতুর করে। যোগমায়া কাত্যায়নীর আরাধনায় মহাপরাধরূপী দশাননের বধ হয় মহাষ্টমীতে, প্রেমভক্তিরূপিণী সীতার উদ্ধার হয় মহানবমীতে। দশমীতে এই পরম সত্যানুভূতিকে হৃদয়ের গভীর তলদেশে চিত্তদর্পণে নিরঞ্জন করে ভক্ত সাধক বিশ্বমানবকে ভাই বলে আলিঙ্গন করেন।
দুর্গাপূজার সার্থকতা তাই কেবল পূজারূপে নয়, পূজাকে কেন্দ্র করে যে-উৎসব তার কেন্দ্রবিন্দুরূপে। ‘দু-এক কথা’র মাঝে এটিই যেন মূলকথা !








