ডায়াবেটিসের মোকাবেলা কীভাবে?

দেবাশীষ কুন্ডু
আজ অবধি, ডায়াবেটিসের প্রায় সমস্ত চিকিৎসারই ভিত্তি হচ্ছে মেটফর্মিন-সম্বলিত ওষুধ-বিষুধ। তবে, এটা একটা ভ্রম যা অজ্ঞ রোগী এবং ডাক্তারদের দ্বারা ছড়ানো হচ্ছে। মেটফর্মিন আপনাদের সরাসরি অসুস্থতা এবং সবশেষে মৃত্যুর রাস্তায় নিয়ে যায়। ওটা কোন চিকিৎসা নয়। আপনি যদি টাইপ 2 ডায়াবেটিস নিয়ে আপনার ডাক্তারের কাছে আসেন এবং তিনি আপনাকে এই ওষুধ সম্বলিত চিকিৎসা দেন, তাহলে আক্ষরিক অর্থেই প্রাণ হাতে করে নিয়ে পালান।
মেটফর্মিন-সম্বলিত কিছু ওষুধ-বিষুধের একটা তালিকা:
ব্যাগোমেট, ভেরো-মেটফর্মিন, গ্লাইকোমেট, গ্লাইকন, গ্লাইমিনফর, গ্লাইফর্মিন, গ্লুকোফা, গ্লুকোফেজ, গ্লুকোফেজ লং, ডাইনর্মেট, ডায়াফর্মিন, ল্যাঙ্গারিন, মেটাডিয়েন, মেটোস্পানিন, মেটফোগ্যামা, মেটফর্মিন, নোভামেট, নোভাফর্মিন সিওফোর, ফর্মেটিন, সোফোর।
এই সব ওষুধই রক্তে ইনসুলিনের মাত্রাকে সংকটজনক মাত্রা অবধি বাড়িয়ে দেয়। ইনসুলিনের আধিক্যের কারণে আপনার রক্ত ঘন হয়ে ওঠে, কিছুটা কন্ডেন্সড মিল্কের মতো। অনেক বেশি পরিমাণে ইনসুলিনের উপস্থিতি আপনার শরীরের সমূহ ক্ষতিসাধন করতে পারে। এটি আক্ষরিক অর্থেই লিভার, কিডনি এবং অন্যান্য রেচন অঙ্গগুলিকে ধ্বংস করে দেয়। ইনসুলিনের ঘনত্ব ও ক্রিয়া আমাদের পাকস্থলীতে উপলভ্য অ্যাসিডের মতোই। ভেবে দেখুন, আপনার শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলি যদি আপনার পাকস্থলীর অ্যাসিডে পূর্ণ হয়ে যায় তাহলে কী হতে পারে। এটি আপনার অঙ্গগুলিকে জ্বালিয়ে দিয়ে বেরিয়ে আসবে!
ইনসুলিনের উচ্চ মাত্রা শরীরের কোষগুলির ক্ষয়সাধন করে, যার ফলে তাদের অস্বাভাবিক বিভাজন ঘটে, আর সেটা ক্যানসারের চেয়ে কম কিছু নয়। সেই কারণেই, পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডায়াবেটিস রোগীদের 28%-এর মধ্যে ক্যানসার রোগ হতে দেখা যায়।
সেই সঙ্গে, ইনসুলিনের মাত্রাধিক্যের কারণেই রক্তবাহগুলিতে কোলেস্টেরলের প্লেক জমে-জমে সেগুলি দ্রুত রুদ্ধ হয়ে যায়, কারণ ইনসুলিন-সম্বলিত রক্ত অপেক্ষাকৃত ঘন হয় এবং কম গতিতে সঞ্চালিত হয়। ফলত, কোলেস্টেরলের প্লেকে পরিপূর্ণ রক্তবাহগুলি রুদ্ধ হয়ে যায় আর তার থেকে উচ্চ রক্তাচাপ তৈরি হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের 98%-ই উচ্চ রক্তাচাপেও আক্রান্ত হন। সেই সঙ্গে আরও অনেক রকমে কার্ডিওভাসকুলার রোগেরও অবির্ভাব ঘটে।
মেটফর্মিন-সম্বলিত ওষুধ দ্বারা চিকিৎসার সম্ভাব্য পরিণামগুলির একটি তালিকা:
গ্যাস্ট্রোইন্টেস্টিনাল বা পাকস্থলী ও অন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত রোগসমূহ (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডায়রিয়া, বুকজ্বালা, চোঁয়া ঢেকুর, পাকস্থলীতে আলসার)
হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ – রক্তচাপ বেড়ে যায়, বিশেষ করে সন্ধ্যে ও রাতেরবেলা, মাথাব্যথা, কানবন্ধ ভাব, ভয়ের আবহ।
সিরোসিস অব লিভার – লিভার একটি যোগকলায় পরিণত হয় এবং রক্তশোধনের কাজ বন্ধ করে দেয়, গোটা শরীর বিষঘটিত পদার্থে ভরে ওঠে।
নুন ও চিনির অতিরিক্ত নিঃসরণের ফলে কিডনিতে পাথর হওয়া
ক্যানসারঘটিত রোগ
ধ্বংসপ্রাপ্ত রক্তবাহের কারণে অকালমৃত্যু
বধিরত্ব
এই সব রোগ হবার বিষয়টি, অবশ্যই, নির্ভর করে ওষুধ খাওয়ার সময় ও পরিমাণের উপর, সেই সঙ্গে একজন ব্যক্তির নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলীর উপরেও। যদিও, এগুলিকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কোনভাবেই সম্ভব নয়!
মেটফর্মিন যদি আমাদের এত ক্ষতিই করে তাহলে তার ব্যবহার করা হয় কেন?
দুর্ভাগ্যবশত, আজকাল বেশিরভাগ ডাক্তারই তাদের কাজটা করেন এবং অর্থ উপার্জন করেন। আপনি ভাল হলেন না খারাপ তাতে তাদের কিছু এসে-যায় না। আর সেই জন্য তাদেরকে তাদের উপরে বসে থাকা চিকিৎসকেরা বা সরকার যা প্রেসক্রাইব করতে নির্দেশ দেয়, তারা দ্বিতীয়বার না ভেবে সেগুলোই আপনাদের দিয়ে দেন। আর তাদেরকে মেটফর্মিন-সম্বলিত ওষুধগুলোই দিতে বলা হয়, যেহেতু তার বিক্রি থেকে প্রচুর পরিমাণে মুনাফা আসে। আর এর প্রভাব তো আছে, অস্থায়ী হলেও।
এই ধরনের উদাসীনতা কিন্তু ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নয়! এই ধরনের ওষুধগুলি নিরন্তর ব্যবহার করে গেলে তাদের কী ক্ষতি হতে পারে সে ব্যাপারে রোগীরা কিছুই জানেন না, আর সেটাই স্বাভাবিক, এবং ডাক্তাররা সে ব্যাপারে তাদের সাথে কথা বলাটা প্রয়োজন মনে করেন না।
রোগীরা বছরের পর বছর ধরে মেটমর্ফিন ব্যবহার করে চিকিৎসা করাচ্ছেন।
তা সত্ত্বেও তার চেক-আপ করালেই দেখতে পান তাদের টাইপ 2 ডায়াবেটিস রয়েছে। একই সাথে তারা, ওই সময় অবধিও, নিয়মমাফিকভাবেই, কখনই এমন বোধ করেননি যে তাদের উচ্চমাত্রায় ব্লাড শুগার রয়েছে। আর তারপর তাদের আবার আরও বেশি মাত্রায় মেটমর্ফিনই প্রেসক্রাইব করা হয়।
ফলস্বরূপ, তাদের শুগারের মাত্রা নেমে যায়, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়ে যেতে থাকে। এই সব রোগীরা দীর্ঘস্থায়ী অবসন্নতা, মোটা হয়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, মাথাব্যথা ইত্যাদি সমস্যার কথা জানাতে থাকেন। তাদের পা ফুলে যেতে থাকে এবং সকালের দিকে তাদের মুখও ফুলে যায়। তাদের মনে হয় তাদের কানের ভিতরে যেন সারাদিন একটা ঘণ্টা বেজে চলেছে। তাদের আঙ্গুলগুলো অসাড় আর অঙ্গপ্রতঙ্গগুলো ঠাণ্ডা হয়ে থাকে। চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। তাদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
ডাক্তারেরা বলেন এই সব কিছুই হচ্ছে ডায়াবেটিসের কারণে। কিন্তু আসলে এই সব কিছুর কারণ হল ইনসুলিন! বা বরং বলা ভাল, মেটমর্ফিনের জন্য যা শরীরে হরমোনের উৎপাদন অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়িয়ে তোলে!
তবে, এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে আপনার ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করানোরই কোন দরকার নেই। আপনাকে যদি মেটমর্ফিন দিয়ে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করানো এবং একেবারেই না করানো এই দুইয়ের মধ্যে জোর করে কোন একটাকে বেছে নিতেই হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে আপনার প্রথমটাই বেছে নেওয়া উচিৎ। চিকিৎসা না করালে টাইপ 2 ডায়াবেটিস আপনাকে আরও আগেই মেরে ফেলবে। অন্যান্য একাধিক রোগলক্ষণগুলোর মাধ্যমে।

ডায়াবেটিস রোগীদের শরীরের অভ্যন্তরের অঙ্গগুলো ঠিক এক রকম চিনি-জারিত চেরি ফলের মতোই দেখায়। লিভার, পাকস্থলী, কিডনি, হৃদপিণ্ড এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, রক্তবাহগুলো…
রক্তবাহের ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলো শর্করা-জারণ:
একটা চিনি মাখানো লজেন্স বা চেরি ফলের কথা ভাবুন। আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে তাহলে আপনার সমস্ত রক্তবাহগুলো অবস্থায় অনেকটা সেইরকমই হয়। রক্তবাহের দেওয়ালগুলো শর্করায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। ফলত, রক্তবাহগুলোর সংকোচন ও প্রসারণের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ছোট-ছোট রক্তবাহগুলো সবার আগে ধ্বংস হয়ে যায়, আর তার ঠিক পরপরই একই পরিণাম হয়ে মাঝারি ও বড় আকারের রক্তবাহগুলোরও। আমাদের রক্তবাহগুলোই আমাদের শরীরের ভিতরের অঙ্গগুলোকে পুষ্টি জোগায়। রক্তসঞ্চালনে অবনতি ঘটলে তা একাধিক দুরারোগ্য রোগের সৃষ্টি করে।
ডায়াবেটিস কীভাবে আপনাক ভিতরে-বাইরে হত্যা করতে শুরু করে:
দৃষ্টিশক্তি হারানো:
ডায়াবেটিস আপনাকে অন্ধ করে দিতে পারে। চিরকালের জন্য। এমনকি লেজার চিকিৎসা দিয়েও ডায়াবেটিসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া চোখের দৃষ্টিশক্তির পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় না, যেহেতু একাধিকবার রক্তক্ষরণের কারণে রেটিনা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার ঘটনা ঘটে।
কিডনি নষ্ট হয়ে যায়:
শর্করা আপনার মূত্রনালীকে রুদ্ধ করে দেয়। কিডনির ভিতরকার পরিবেশ অস্বাভাবিক রকমের মিষ্টি হয়ে ওঠে। শর্করা এক ধরনের সংরক্ষণকারী বস্তু বা প্রিজারভেটিভ। এটি কিডনিকে সংরক্ষণ করে রাখে। কালক্রমে সেগুলোর মৃত্যু ঘটে। দুরারোগ্য কিডনি বিকলত্ব হিমশৈলের চূড়াটা মাত্র। আপনি আপনার দুটো কিডনিই চিরতরে হারাতে পারেন।
সন্ধিগুলোর গতিবিধি বন্ধ হয়ে যায়:
সন্ধিগুলোকে গতিবিধি প্রদান করে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড নামক এক ধরনের তরল। রক্তবাহগুলো যখন সন্ধিগুলোতে পুষ্টি জোগানো বন্ধ করে দেয়, তখন আর তা থেকে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড ক্ষরিত হয় না। সন্ধগুলো শুকিয়ে যায়। পরিণামস্বরূপ রোগী দঃসহ যন্ত্রণা সহ্য করতে বাধ্য হন। কোন ব্যথার ওষুধও কোন কাজ করে না। সন্ধিগুলো পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে পড়ে। রোগী নিজে থেকে চলাফেরা করতে অক্ষম হয়ে পড়ে।
স্নায়ুতন্ত্র বিকল হয়ে আসে:
নার্ভগুলো, অন্যান্য আরো অঙ্গগুলোর মতোই, অতিরিক্ত শর্করার চাপে ধুঁকতে থাকে। সময়ের সাথে সাথে, একজন ডায়াবেটিক রোগী মানসিকভাবে রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েন, আবেগগতভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। তারা অবসাদ বা ডিপ্রেশনে ভুগতে শুরু করেন, জীবনের কোন কিছুই তাদের আনন্দ দিতে পারে না। তারা শুধু শুয়ে-শুয়ে থাকতে চান এবং মরে যেতে চান।
ত্বক পচতে শুরু করে:
শুরুতে ত্বক অত্যধিক শুষ্ক হয়ে ওঠে, খড়ি উঠতে শুরু করে, তারপর তাতে এগজিমা ও আলসার সৃষ্টি হয়। মাংসাপেশি ও হাড়গুলো পচতে শুরু করে এবং সেগুলো ত্বক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে শুরু করে। গা থেকে দুর্গন্ধ বেরোয়। এই সব কিছু শেষে গ্যাংগ্রিনে পর্যবসিত হয়।
ডায়াবেটিস একটি অত্যন্ত ভয়ানক ব্যাধি। সম্ভবত সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাধি। উদাহরণস্বরূপ সেই সব বরিষ্ঠ নাগরিকদের কথা ভাবুন যারা বয়সের কারণে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন। তাদের রক্তে চিনির মাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকে , মেটমর্ফিন নিয়েও সুস্থ বোধ করেন না। তাহলে আমরা ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করব কীভাবে?
কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, খাদ্যাভ্যাস , ধ্যান আর যোগা অথবা হালকা শরীরচর্চা নিতে পারে কার্যকরী ভূমিকা।

মন্তব্য করুন