
সনাতনী ধর্মে ভাদ্রপদ পূর্ণিমা থেকে শুরু করে আশ্বিন অমাবস্যা পর্যন্ত পনেরো দিনকে পিতৃপক্ষ বা মহালয়া পক্ষ বলা হয়। এ সময়টিকে বিশেষভাবে শ্রাদ্ধ, পিণ্ডদান ও তর্পণ প্রভৃতি মাধ্যমে পিতৃপুরুষদের স্মরণ ও তৃপ্তি দানের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মাহাত্ম্য
১. পিতৃঋণ মোচন
মানবজীবনের তিনটি ঋণ বলা হয়েছে— দেবঋণ, ঋষিঋণ ও পিতৃঋণ। এর মধ্যে পিতৃঋণ মানব জন্মের ভিত্তি। এই ঋণ মোচনের প্রধান মাধ্যম হলো পিতৃপক্ষকালে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান, অন্নদান ও তর্পণ করা।
২. পিতৃপুরুষদের তৃপ্তি
বিশ্বাস করা হয়, এই সময় পিতৃলোক থেকে আত্মারা পৃথিবীতে নেমে আসেন। ভক্তিভরে অন্ন, জল, তিল, কুশা প্রভৃতির দ্বারা তর্পণ করলে তারা তৃপ্ত হয়ে আশীর্বাদ প্রদান করেন।
৩. অতৃপ্ত আত্মার শান্তি
যেসব আত্মা জীবদ্দশায় অকালমৃত্যু, দুর্ঘটনা বা অপরিণত অবস্থায় প্রস্থান করেছেন, পিতৃপক্ষকালে তাদের জন্য দান ও পিণ্ড প্রদান করলে তারা মুক্তি লাভ করেন।
4. আশীর্বাদ লাভ
শাস্ত্রে আছে—
> “পিতৃণাং তৃপ্তিমাপন্নে তৃপ্তাস্তি দেবতা অপি।”
অর্থাৎ, পিতৃপুরুষ সন্তুষ্ট হলে দেবতারা পর্যন্ত সন্তুষ্ট হন। পরিবারের শান্তি, সমৃদ্ধি ও উত্তরসন্তানদের মঙ্গল লাভ হয়।
৫. ধর্ম ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ
পিতৃপক্ষ মূলত জীবিতদের কর্তব্যস্মরণ। যাদের কারণে আমাদের জন্ম ও বংশধারা, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এক মহান ধর্ম।
পিতৃপক্ষের বিশেষ আচার
—————————
শ্রাদ্ধ : অন্ন, জল ও পিণ্ড অর্পণের মাধ্যমে পূর্বপুরুষকে সন্তুষ্ট করা।
তর্পণ : কুশা, তিল ও জল দ্বারা পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য প্রদান।
দান : ব্রাহ্মণ ও অভাবীদের অন্নদান ও বস্ত্রদান, যা পিতৃপুরুষদের কল্যাণে ফলপ্রদ বলে মানা হয়।
মহালয়া অমাবস্যা : পিতৃপক্ষের শেষ দিনটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন বিশেষ শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করলে অগণিত পূর্বপুরুষ শান্তি ও মুক্তি লাভ করেন বলে বিশ্বাস।
পিতৃপক্ষ আমাদের শিকড়ের সাথে যোগসূত্রের সময়। এই সময়ে পূর্বপুরুষদের স্মরণ, কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন ও আত্মার মুক্তির প্রার্থনার মধ্য দিয়ে আমরা শুধু আধ্যাত্মিক দায় শোধ করি না, নিজের ও পরিবারের জীবনে মঙ্গল ও শান্তি আনয়ন করি।
সনাতনী বিশ্বাসে তাই বলা হয়—
“পিতরঃ সন্তুষ্টা যঃ, তস্য ভবতি সর্বমঙ্গলম্।”
অর্থাৎ, পিতৃপুরুষ সন্তুষ্ট হলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে মঙ্গল নেমে আসে।









