অমৃতবিন্দু উপনিষৎ শান্তিপাঠ

ওঁ সহ নাববতু, সহ নৌ ভুনক্তু, সহ বীর্যং করবাবহৈ । তেজস্বি নাবধীতমস্তু মা বিদ্বিষাবহৈ॥
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ।
হরিঃ ওঁ ॥
*অনুবাদঃ * পরমাত্মা আমাদের উভয়কে সমানভাবে রক্ষা করুন। এবং উভয়কে তুল্যভাবে বিদ্যাফল দান করুন; আমরা যেন সমান ভাবে সামর্থ্য অর্জন করতে পারি; আমাদের উভয়েরই লদ্ধ বিদ্যা সফল হোক; আমরা যেন পরষ্পরকে বিদ্বেষ না করি।
ওঁ শান্তি, শান্তি,শান্তি।
মনো হি দ্বিবিধং প্রোক্তং শুদ্ধং চাশুদ্ধমেব চ ।
অশুদ্ধং কামসংকল্পং শুদ্ধং কামবিবর্জিতম্ ॥ (১)
অনুবাদঃ মন দুই প্রকার। অশুদ্ধ এবং শুদ্ধ। অশুদ্ধ মনে কামনা-বাসনা জর্জরিত; শুদ্ধ মন কামনা-বাসনা বিবর্জিত। (১)
মন এব মনুষ্যাণাং কারণং বন্ধমোক্ষয়োঃ ।
বন্ধায় বিষয়াসক্তং মুক্তং নির্বিষয়ং স্মৃতম্ ॥ (২)
অনুবাদঃ কেবলমাত্র মনই জীবের বন্ধন ও মুক্তির কারণ। যখন মন বিষয়ে আসক্ত হয় তখন বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু যখন নিষ্কাম হয়ে বাসনা ত্যাগ করে তখনই মুক্তি সম্ভব।। (২)
য়তো নির্বিষয়স্যাস্য মনসো মুক্তিরিষ্যতে ।
অতো নির্বিষয়ং নিত্যং মনঃ কার্যং মুমুক্ষুণা।। (৩)
অনুবাদঃ মোক্ষ বিষয় আসক্তি শূন্য মনের উপর নির্ভরশীল। সেহেতু যিনি মোক্ষ লাভের প্রয়াসী তার মন সর্বদাই বিষয় আসক্তি হতে নিবৃত্ত করতে হবে। (৩)
নিরস্তবিষয়াসঙ্গং সংনিরুদ্ধং মনো হৃদি ।
য়দাঽঽয়াত্যাত্মনো ভাবং তদা তত্পরমং পদম্ ॥ (৪)
অনুবাদঃ যখন মন বিষয়াসক্তি থেকে মুক্ত হয় তখন সেটি হৃদয়ে সম্পূর্ণ সংযত থাকে। মনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেই সর্বোচ্চ লক্ষ্যে পৌছানো সম্ভব। (৪)
তাবদেব নিরোদ্ধব্যং য়াবধৃদি গতং ক্ষয়ম্ ।
এতজ্জ্ঞানং চ ধ্যানং চ শেষো ন্যায়শ্চ বিস্তরঃ।। (৫)
অনুবাদঃ মনকে চঞ্চলতা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ। যা কেবল সংযত হৃদয়েই করা সম্ভব। এটার জন্য প্রয়োজন সূক্ষ্মজ্ঞান এবং ধ্যান। ধ্যানের দ্বারাই শুদ্ধজ্ঞান ও সূক্ষ্মবিচারের উন্মেষ ঘটে। (৫)
নৈব চিন্ত্যং ন চাচিন্ত্যং ন চিন্ত্যং চিন্ত্যমেব চ ।
পক্ষপাতবিনির্মুক্তং ব্রহ্ম সম্পদ্যতে তদা॥ (৬)
অনুবাদঃ মনের দ্বারা ব্রহ্ম বোধগম্য নয়, আবার মনের দ্বারাই ব্রহ্ম অণুদ্রষ্টব্য। যদিও ব্রহ্ম অচিন্ত্যনীয়, তবুও হৃদয়ের মধ্যেই ব্রহ্ম অনুসন্ধান করতে হয়। সমদর্শী মনোভাবের উদয় হলেই ব্রহ্মভাব উপলব্ধি আসে। (৬)
স্বরেণ সংধয়েদ্যোগমস্বরং ভাবয়েত্পরম্ ।
অস্বরেণানুভাবেন নাভাবো ভাব ইষ্যতে ॥ (৭)
অনুবাদঃ প্রথমে শব্দের (ওঁ উচ্চারণ) সাথে ধ্যান অভ্যাস করবে। তারপর শব্দ ব্যাতীত নির্বিশেষ ব্রহ্মের ধ্যান করবে। শব্দ ত্যাগপূর্বক ধ্যান করলেও বাস্তবিক সত্তার নাশ ঘটে না। (৭)
তদেব নিষ্কলং ব্রহ্ম নির্বিকল্পং নিরঞ্জনম্ ।
তদ্ব্রহ্মাহমিতি জ্ঞাত্বা ব্রহ্ম সম্পদ্যতে ধ্রুবম্ ॥ (৮)
অনুবাদঃ সেই অদ্বিতীয় ব্রহ্ম অখণ্ড, নির্বিকল্প, সমস্ত দোষ বিবর্জিত ও নির্বিকার। এরূপ উপলব্ধি “আমি ব্রহ্ম” দ্বারা ব্রহ্মের নিত্যভাব প্রাপ্ত হওয়া যায়। (৮)
নির্বিকল্পমনন্তং চ হেতুদৃষ্টান্তবর্জিতম্ ।
অপ্রমেয়মনাদিং চ য়জ্জ্ঞাত্বা মুচ্যতে বুধঃ ॥ (৯)
অনুবাদঃ নির্বিকল্প, নির্বিশেষ এবং কারণ ব্রহ্মের সাথে সমত্ব দর্শন হেতু ব্রহ্মজ্ঞানী পরমব্রহ্মে লীন হয়ে যান। (৯)
ন নিরোধো ন চোত্পত্তির্ন বদ্ধো ন চ সাধকঃ ।
ন মুমুক্ষুর্ন বৈ মুক্ত ইত্যেষা পরমার্থতা ॥ (১০)
অনুবাদঃ পারমার্থিক সত্য তথা আত্মোপলব্ধি হলে জড় ইন্দ্রিয় বিলুপ্ত হয়। বিষয়াসক্তিও থাকে না। তখন তিনি না আবদ্ধ, না উপাসক। মুক্তি লাভের প্রতি তার আর ইচ্ছাও অবশিষ্ট থাকে না কিংবা মুক্তির পরেও তিনি বিচলিত নন। (১০)
এক এবাত্মা মন্তব্যো জাগ্রত্স্বপ্নসুষুপ্তিষু ।
স্থানত্রয়ব্যতীতস্য পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে ॥ (১১)
অনুবাদঃ জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি এই তিন অবস্থা অতিক্রম করলে তার আর পুণর্জন্ম হয় না। এই তিন অবস্থাতে তখন কেবলমাত্র এক আত্মাই জ্ঞাত হয়। (১১)
এক এব হি ভূতাত্মা ভূতে ভূতে ব্যবস্থিতঃ ।
একধা বহুধা চৈব দৃশ্যতে জলচন্দ্রবত্ ॥ (১২)
অনুবাদঃ এক আত্মাই সর্বভূতে বিরাজ করে। চন্দ্রের প্রতিবিম্ব যেমন বহু জলাশয়ে দেখা যায় কিন্তু চন্দ্র একটাই হয় তেমন এক অখণ্ড আত্মাই বহুরূপে দর্শিত হয়ে। (১২)
ঘটসংবৃতমাকাশং নীয়মানো ঘটে য়থা ।
ঘটো নীয়েত নাকাশঃ তদ্বজ্জীবো নভোপমঃ। (১৩)
অনুনাদঃ একটি ঘট যতটা আকাশ দখল করে থাকে। সেই ঘট অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেলেও সেই জায়গায় যেমন আকাশ অনুপস্থিত থাকে না। তদ্রুপ মুক্ত জীবের চৈতন্য সত্তাও আকাশ এর মত নিত্য এবং সর্বত্র সমভাবে বিরাজ করে। (১৩)
ঘটবদ্বিবিধাকারং ভিদ্যমানং পুনঃ পুনঃ ।
তদ্ভেদে (তদ্ভগ্নং) ন চ জানাতি স জানাতি চ নিত্যশঃ॥ (১৪)
অনুবাদঃ বারংবার বিভিন্ন প্রকার ঘট বানিয়ে ভেংগে ফেললেও আকাশ সেটি জানতে পারে না। কিন্তু জীব বার বার দেহধারণ করে বার বার দেহত্যাগ করলেও আত্মা সর্বব্যাপী হেতু তার নিত্যতা জানতে পারে। (১৪)
শব্দমায়াবৃতো নৈব তমসা য়াতি পুষ্করে ।
ভিন্নে তমসি চৈকত্বমেক এবানুপশ্যতি ॥ (১৫)
অনুবাদঃ অজ্ঞনতার জন্য মায়া নামক শব্দে আচ্ছাদিত হলে সেই মনসরোবর অনেক দূর মনে হয়। কিন্তু অজ্ঞানতার নাশ হলে সকল দূরত্ব মিটে যায় এবং সকল কিছুই আমি এরূপ একত্ব দর্শন হয়। (১৫)
শব্দাক্ষরং পরং ব্রহ্ম তস্মিন্ক্ষীণে য়দক্ষরম্ ।
তদ্বিদ্বানক্ষরং ধ্যায়েদ্যদীচ্ছেচ্ছান্তিমাত্মনঃ। (১৬)
অনুবাদঃ প্রথমে শব্দব্রহ্ম ওঁ কে ব্রহ্মরূপে ধ্যান করা উচিৎ। যখন এই ওঁ রূপ ব্রহ্মপ্রতীক বিলীন হয়ে যায় তখন কেবল নির্বিশেষ ব্রহ্মই থাকেন। বিদ্বান ব্যাক্তির উচিৎ সেই নির্বিশেষ ব্রহ্মের ধ্যান করা যদি সে পরম শান্তি ও চিত্তের স্থিরতা প্রাপ্ত করতে চায়। (১৬)
দ্বে বিদ্যে বেদিতব্যে তু শব্দব্রহ্ম পরং চ য়ত্ ।
শব্দব্রহ্মণি নিষ্ণাতঃ পরং ব্রহ্মাধিগচ্ছতি।। (১৭)
অনুবাদঃ দুই প্রকারের ধ্যানাভ্যাস করা যেতে পারে। শব্দ ব্রহ্ম ওঁ এর ধ্যান এবং নিরাকার ব্রহ্ম এর ধ্যান। কেননা শব্দ ব্রহ্ম ওঁ প্রতীক এর মাধ্যম হল সেই নিরাকার তথা নির্বিশেষ ব্রহ্মে পৌছানোরই কৌশল। (১৭)
গ্রন্থমভ্যস্য মেধাবী জ্ঞানবিজ্ঞানতত্পরঃ ।
পলালমিব ধান্যার্থী ত্যজেদ্ গ্রন্থমশেষতঃ ॥ (১৮)
অনুবাদঃ বুদ্ধিমান ব্যাক্তি শাস্ত্র অধ্যয়ন করে জ্ঞান অর্জনে সচেষ্ট হয় এবং মুক্তির ব্যাপারে জানতে পারে। তারপর সমস্ত কিছুর সাথে শাস্ত্রকেও ত্যাগ করে যেমন চাউল পাওয়ার জন্য আমরা ধানের তুষ/খোলস ছাটাই করে ফেলি। (১৮)
গবামনেকবর্ণানাং ক্ষীরস্যাপ্যেকবর্ণতা ।
ক্ষীরবত্পশ্যতে জ্ঞানং লিঙ্গিনস্তু গবাং য়থা। (১৯)
অনুবাদঃ যেমন ভিন্ন ভিন্ন গাভী বিভন্ন রঙের হলেও তার দুগ্ধ এর রং একই (সাদা) হয়। তেমনি বিভিন্ন শাস্ত্রসমূহ হল ভিন্ন ভিন্ন গাভীর ন্যায় আর জ্ঞান হল তার দুগ্ধ। (১৯)
ঘৃতমিব পয়সি নিগূঢং ভূতে ভূতে চ বসতি বিজ্ঞানম্ ।
সততং মনসি মন্থয়িতব্যং মনো মন্থানভূতেন। (২০)
অনুবাদঃ পায়েসের মধ্যে যেমন ঘৃত লুকায়িত থাকে তেমনি চৈতন্যও সর্বভূতে বিরাজ করছে। সর্বদা সেই চৈতন্য সত্তাকে মনে মনে সর্বভূতে অনুসন্ধান করতে হবে। (২০)
জ্ঞাননেত্রং সমাধায় চোদ্ধরেদ্বহ্নিবত্পরম্ ।
নিষ্কলং নিশ্চলং শান্তং তদ্ব্রহ্মাহমিতি স্মৃতম্। (২১)
অনুবাদঃ সর্বদাই সেই জ্ঞান নামক দঁড়ি ধরে থাকা উচিৎ। একসময় সেই ব্রহ্ম প্রকাশিত হবেই। অর্থাৎ দঁড়ি ধরে থাকলে একসময় দড়ি পুড়তে পুড়তে শেষ হয়ে আগুণ হাতকে স্পর্শ করবেই। আমিই সেই নির্বিকার, শান্ত, নিত্য ব্রহ্ম এই সত্য স্মরণ হবেই। (২১)
সর্বভূতাধিবাসং য়দ্ভূতেষু চ বসত্যপি ।
সর্বানুগ্রাহকত্বেন তদস্ম্যহং বাসুদেবঃ ॥ (২২)
অনুবাদঃ সমস্ত ভূতেই যিনি বাস করেন এবং সমস্ত ভূত যে সৎ দ্বারা আখ্যায়িত, যিনি সমস্ত কিছুর কারণ, সকলের অনুগ্রাহক সেই বাসুদেব আমিই। আমিই মহাবিশ্বের আত্মা। (২২)
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ।
হরিঃ ওঁ ॥
ইতি কৃষ্ণ যজুর্বেদেঽমৃতবিন্দূপনিষত্ সমাপ্তা ॥

মন্তব্য করুন