
শ্রীকৃষ্ণ ও গান্ধারীর সংলাপটি মহাভারতের স্ত্রীপর্ব-এর মূল ঘটনার একটি গভীর শিক্ষামূলক রূপ। মূল মহাভারতে গান্ধারী যুদ্ধের পর শোকে মুহ্যমান হয়ে শ্রীকৃষ্ণকে অভিযোগ করেন এবং যাদববংশ ধ্বংসের অভিশাপ দেন। কিন্তু এই জনপ্রিয় আলোচনায় শ্রীকৃষ্ণ যে “অন্ধ স্নেহ”-এর কথা বলছেন, তা মহাভারতের মূল দর্শনের সার। এটি সনাতন ধর্মের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ: ধর্মের সামনে ব্যক্তিগত মমতা বা স্নেহ কখনোই অন্ধ হতে পারে না।
১. সনাতন দর্শন কী বলে এখানে?
সনাতন ধর্ম (যা বেদ, উপনিষদ, গীতা ও মহাভারতের মাধ্যমে প্রকাশিত) বলে:
ধর্মই সর্বোচ্চ। “যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ” — যেখানে ধর্ম, সেখানেই জয়।
মোহ (অন্ধ সংলগ্নতা) হলো জীবের সবচেয়ে বড় শত্রু। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় বলেছেন (২/৬২-৬৩): অতিরিক্ত স্নেহ থেকে কামনা, ক্রোধ, বিভ্রান্তি এবং শেষে ধ্বংস হয়।
গান্ধারীর চোখের পট্টি শুধু স্বামী ধৃতরাষ্ট্রের প্রতি সহমর্মিতা নয় — এটি পুত্রমোহের প্রতীক। তিনি সন্তানদের অন্যায় (দুর্যোধনের লোভ, দ্রৌপদীর অপমান, পাণ্ডবদের প্রতি ষড়যন্ত্র) দেখেও চোখ বুজে রেখেছিলেন। ফলে অধর্ম বেড়েছে, কুরুক্ষেত্র হয়েছে।
মহাভারতের সার কথা: অন্ধ স্নেহ ধর্মের বিরোধী। ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ মমতা ও গান্ধারীর অন্ধ সহানুভূতি মিলে কৌরবদের ধ্বংস ডেকে এনেছে। শ্রীকৃষ্ণ তাই বলছেন — “তুমি শুধু স্বামীর জন্য নয়, সন্তানদের অন্যায়কেও আড়াল করেছিলে।” এটি সনাতন দর্শনের মূল বাণী: সত্যকে আড়াল করলে তা প্রিয়জনকে বাঁচায় না, ধ্বংস করে।
২. মহাভারতের আলোকে আমাদের করণীয় কী?
মহাভারত আমাদের শেখায় যে, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে (পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র) আমাদের কর্তব্য হলো:
প্রিয়জনের ভুল দেখেও সংশোধন করা
গান্ধারী যদি সময়মতো দুর্যোধনকে ধর্মের পথে ফিরিয়ে আনতেন (তিনি একবার চেষ্টা করেছিলেন বলে উল্লেখ আছে), তাহলে হয়তো যুদ্ধ হতো না। আজ আমরা যদি সন্তান/স্বামী/স্ত্রী/আত্মীয়ের অন্যায় দেখেও “চোখ বুজে” থাকি, তাহলে সেই অন্ধ স্নেহ তাদের ধ্বংসের কারণ হয়। সনাতন দর্শনে স্নেহ ভুল, কিন্তু স্নেহের সঙ্গে বিবেক (viveka) থাকতে হবে।
ধর্মের পক্ষে দাঁড়ানো, এমনকি পরিবারের বিরুদ্ধেও
ভগবদ্গীতায় অর্জুন যখন পরিবারের কথা ভেবে যুদ্ধ করতে চাননি, শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন — “এই দেহগুলো নশ্বর, ধর্ম অমর।” যুধিষ্ঠির, ভীষ্ম, দ্রোণ — সবাই জানতেন কৌরবরা অধর্ম করছে, কিন্তু নিজেদের সংলগ্নতায় পড়ে ধর্মের পথ ছাড়েননি (যদিও ভুল করেছেন)। আমাদেরও তাই: পরিবারের স্বার্থে অধর্মকে সমর্থন করা চলবে না।
সত্যের পথে চলা ও প্রশ্রয় না দেওয়া
“নিজের প্রিয়জনের ভুলকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে তাকে বাঁচানো নয়, বরং ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া।”
এটি আজকের সমাজের জন্যও প্রাসঙ্গিক — সন্তানের অন্যায় লুকিয়ে রাখা, রাজনীতিতে নিজের দলের ভুল আড়াল করা, বা সমাজে অন্যায় দেখেও চুপ থাকা — সবই “অন্ধ স্নেহ”-এর রূপ।
সারকথা (সনাতন দর্শনের মূল বাণী)
শ্রীকৃষ্ণ যা বলছেন, তা গীতারই প্রতিধ্বনি: ভালোবাসা যদি সত্য ও ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে তা বিষ হয়ে দাঁড়ায়। সত্যিকারের মাতৃস্নেহ, পিতৃস্নেহ বা বন্ধুত্ব হলো — প্রিয়জনকে ধর্মের পথে রাখা, ভুল হলে সংশোধন করা, এবং নিজেও ধর্মপথে অটল থাকা।
মহাভারত আমাদের বলে: যুদ্ধ জিতলেও যদি ধর্ম না থাকে, তাহলে সবই ব্যর্থ। গান্ধারীর তপস্যা ব্যর্থ হয়নি — কিন্তু তা যদি সন্তানদের সংশোধনে ব্যবহৃত হতো, তাহলে কুরুক্ষেত্রের ধ্বংস এড়ানো যেত।
আজকের দিনে আমাদের করণীয় খুব সহজ কিন্তু কঠিন: প্রিয়জনকে ভালোবাসো, কিন্তু তাদের ভুলকে আড়াল করো না। ধর্মের চোখ খোলা রাখো। এটিই সনাতন দর্শনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা — অন্ধ স্নেহ নয়, জ্ঞানযুক্ত স্নেহই মুক্তির পথ।








