ককনমঠ মন্দির: যেখানে পাথর কথা বলে, আর রহস্যেরা খেলা করে!

দেবাশীষ কুন্ডু:

ভারতের মধ্যপ্রদেশে মুরেনা জেলার সিহোনিয়া গ্রামে বিজন জঙ্গলে দাঁড়িয়ে আছে এক হাজার বছরের প্রাচীন এক শিবালয়— ককনমঠ – এক ঐতিহাসিক ও রহস্যময় শিবালয় । ১১শ শতকে কচ্ছপঘাত রাজবংশের রাজা কীর্তিরাজ তাঁর রানি কাকনবতীর নির্দেশে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। এই মন্দিরটি শুধু একটি স্থাপত্য নয়, বরং এক জীবন্ত বিস্ময়। কেন এই মন্দিরটি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে এত রহস্যময়? জানুন এর কিছু শিহরণ জাগানো তথ্য:
এই বিশাল মন্দিরটি তৈরিতে কোনো সিমেন্ট, বালি বা চুন ব্যবহার করা হয়নি। কেবল নিখুঁত ভারসাম্যে একটি পাথরের ওপর আরেকটি পাথর বসিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় ১০০ ফুট উঁচু এই মন্দিরটি এখনও ঠিক কীভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তা স্থাপত্য বিশেষজ্ঞদের কাছেও এক বিস্ময়। এক হাজার বছর ধরে বড় বড় ঝড় বা ভূমিকম্পও এর একটি পাথরকে তার জায়গা থেকে নড়াতে পারেনি।
এই অবিশ্বাস্য পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনটির সঙ্গে এক রোমাঞ্চকর লোককথা জড়িয়ে রয়েছে , স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই মন্দিরটি মানুষের হাতে তৈরি নয়। এক রাতে মহাদেবের অনুচর ভূতরা এটি নির্মাণ শুরু করেছিল। কাজ শেষ হওয়ার আগেই ভোর হয়ে যাওয়ায় এবং গ্রামবাসীর শব্দ পাওয়ায় তারা মন্দিরটি অসমাপ্ত রেখেই চলে যায়। আজও বাইরের দিকে তাকালে মনে হয় পাথরগুলো শূন্যে ভাসছে।
মন্দিরের গর্ভগৃহে কোনো জানালা নেই, তবুও প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের আলো একটি সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে সরাসরি শিবলিঙ্গের ওপর পড়ে। যেখানে অনেক প্রযুক্তি আর ইঞ্জিনিয়ার দের পরিকল্পনা কে কাজে লাগিয়ে সদ্য নির্মিত অযোধ্যায় রামলালা মন্দিরে শ্রীরামচন্দ্রের সূর্য তীলক করা হয় , সেখানে হাজার বছর আগে কোনো আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়াই এই নিখুঁত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় রহস্য।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মন্দিরের আশেপাশে কয়েক মাইল পর্যন্ত এমন কোনো পাহাড় নেই যেখান থেকে এই ধরণের ৯ লক্ষ পাথর আনা সম্ভব ছিল। বিশ্বাস করা হয়, এই পাথরগুলো অলৌকিকভাবে এখানে আনা হয়েছিল। ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মূল মন্দিরের চারপাশের ছোট মন্দিরগুলি ধ্বংস হয়ে গেলেও, প্রধান শিবালয়টি আজও অক্ষত রয়েছে।
মন্দির চত্বরে ছোট ছোট পাথর দিয়ে ঘর বানানোর একটি সুন্দর প্রথা আছে। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এখানে পাথরের ঘর বানালে মহাদেব তাদের নিজেদের বাড়ি তৈরির স্বপ্ন পূরণ করেন।
ভারতের এই বিস্ময়কর ঐতিহ্যটি আমাদের প্রাচীন স্থাপত্যবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন। আপনি যদি রহস্য আর ইতিহাসের অনুরাগী হন, তবে ককনমঠ আপনার গবেষণার তালিকার শীর্ষে থাকা উচিত।

মন্তব্য করুন