শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের আলোকে রাস, রাসলীলা ও রাসতত্ত্ব

শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ হিন্দুশাস্ত্রের অন্যতম মহাপুরাণ। এতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলা-কথা, ভক্তিমার্গের মহিমা এবং পরমতত্ত্বের বিস্তৃত বর্ণনা রয়েছে। এর দশম স্কন্ধকে ভাগবতের প্রাণ বলা হয়। এই স্কন্ধের ২৯ থেকে ৩৩ অধ্যায়—যা “রাসপঞ্চাধ্যায়ী” নামে খ্যাত—রাসলীলার বিবরণে পূর্ণ। এই পাঁচ অধ্যায় শুধু একটি লীলার কাহিনি নয়; এটি ভক্তি-রসের চূড়ান্ত প্রকাশ এবং পরমার্থ-তত্ত্বের গভীর আলোকপাত।

রাস কী?
সংস্কৃত “রস” শব্দের অর্থ হলো স্বাদ, আনন্দ, মধুর অনুভূতি বা পরমানন্দ। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে, ভগবান নিজেই রসস্বরূপ—“রসো বৈ সঃ”। এই রস সাধারণ ইন্দ্রিয়সুখ নয়। এটি অপ্রাকৃত, চিন্ময় ও অনন্ত আনন্দের স্বাদ। ভক্তি-শাস্ত্রে পাঁচ প্রধান রস বর্ণিত হয়েছে: শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর। এর মধ্যে মধুররস (শৃঙ্গাররস) সর্বোচ্চ। রাসলীলা এই মধুররসের পূর্ণতম প্রকাশ।

রাস শব্দটি এখানে কেবল নৃত্য বা গীতের সমষ্টি নয়। এটি ভগবানের সঙ্গে জীবাত্মার প্রেমময় মিলনের আনন্দ। শ্রীধর স্বামী ও অন্যান্য আচার্যের মতে, নৃত্য, গীত, আলিঙ্গন, চুম্বন প্রভৃতি অনুভাবসমূহের সমষ্টিই রাস। কিন্তু এর মূল তত্ত্ব হলো—ভগবানের হ্লাদিনীশক্তির সঙ্গে তাঁর নিজের আনন্দ-আস্বাদন।

রাসলীলার বর্ণনা (ভাগবত ১০/২৯–৩৩)
শরৎকালের পূর্ণিমা রাতে যমুনা তীরে বৃন্দাবনের বনভূমিতে শ্রীকৃষ্ণ বংশীবাদন করেন। বংশীধ্বনি শুনে গোপীগণ গৃহ, স্বামী, সন্তান—সব ত্যাগ করে কৃষ্ণের কাছে ছুটে আসেন। কৃষ্ণ প্রথমে তাঁদের পরীক্ষা করেন—ধর্ম, লজ্জা ও সামাজিক কর্তব্যের কথা বলে বাড়ি ফিরে যেতে বলেন। কিন্তু গোপীদের প্রেম এত গভীর যে তাঁরা কোনো বাধা মানেন না।
তারপর কৃষ্ণ অন্তর্ধান হন। গোপীগণ বনে বনে কৃষ্ণকে খুঁজে বেড়ান, তাঁর লীলা অনুকরণ করেন এবং বিরহে গোপীগীত গান করেন। এই বিরহ-ভাগই রাসলীলার অন্যতম গভীর অংশ। পরে কৃষ্ণ পুনরায় প্রকাশিত হন এবং গোপীদের প্রেমের প্রকৃতি ব্যাখ্যা করেন।
অবশেষে মহারাস শুরু হয়। গোপীগণ বৃত্তাকারে দাঁড়ান। কৃষ্ণ যোগমায়ার প্রভাবে নিজেকে বহু রূপে প্রকাশ করে প্রতিটি গোপীর পাশে দাঁড়ান। প্রত্যেক গোপী মনে করেন যে কৃষ্ণ কেবল তাঁরই সঙ্গে নৃত্য করছেন। এই রহস্যময় লীলায় কৃষ্ণ একই সঙ্গে এক ও বহু। আকাশের দেবতাগণ, গন্ধর্ব ও অপ্সরারা এই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হন।
ভাগবত স্পষ্ট করে বলেছে যে এই লীলা কামক্রীড়া নয়। যিনি এই লীলা শ্রদ্ধার সঙ্গে শ্রবণ বা বর্ণনা করেন, তিনি পরম ভক্তি লাভ করেন এবং হৃদয়ের কামরূপ রোগ দূর হয় (১০/৩৩/৩৯)। কৃষ্ণ এখানে পরম নিয়ন্তা; তাঁর লীলা সাধারণ নর-নারীর আচরণের মতো নয়। সাধারণ ব্যক্তি যদি তাঁর অনুকরণ করতে যায়, তবে তা আত্মনাশের কারণ হয়।

রাসতত্ত্বের গভীর অর্থ:
রাসতত্ত্ব ভাগবতের সর্বোচ্চ রহস্য। এর কয়েকটি মূল দিক:
১. প্রেম ও কামের পার্থক্য: গোপীদের প্রেম স্বার্থশূন্য। তাঁরা কৃষ্ণকে নিজেদের সুখের জন্য চান না; কৃষ্ণের সুখই তাঁদের একমাত্র কামনা। কাম নিজেকে নেয়, প্রেম নিজেকে দেয়।
২. যোগমায়ার ভূমিকা: রাসলীলা যোগমায়ার প্রভাবে সংঘটিত। এটি মায়া নয়, বরং ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তি। এর ফলে গোপীদের দেহও চিন্ময় হয়ে ওঠে এবং লীলা অপ্রাকৃত থাকে।
৩. এক ও বহুর তত্ত্ব: কৃষ্ণ এক হলেও প্রতি গোপীর সঙ্গে পূর্ণভাবে উপস্থিত থাকেন। এটি দেখায় যে ভগবান অনন্ত এবং প্রত্যেক ভক্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ব্যক্তিগত ও সম্পূর্ণ।
৪. মধুররসের শ্রেষ্ঠত্ব: অন্যান্য রসও উচ্চ, কিন্তু মধুররসে আত্মসমর্পণ সর্বাধিক। রাসলীলা এই রসের চূড়ান্ত প্রকাশ। রাধা ও গোপীগণ কৃষ্ণের হ্লাদিনীশক্তির বিস্তার।
৫. বিরহ ও মিলনের দ্বৈত আনন্দ: রাসলীলায় মিলন ও বিরহ উভয়ই আছে। বিরহে প্রেম আরও গভীর হয়। গোপীগীত এই বিরহ-প্রেমের অমর প্রকাশ।
৬. ভক্তির চরম লক্ষ্য: ভাগবতের মতে, রাসলীলা শ্রবণ করলেই কামনা দূর হয় এবং ভগবৎ-প্রেম জন্মে। এটি কলিযুগে ভক্তির সহজ ও শ্রেষ্ঠ পথের ইঙ্গিত দেয়।

শ্রীমদ্ভাগবতের রাসলীলা কেবল একটি সুন্দর কাহিনি নয়। এটি পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার চরম প্রেমমিলনের প্রতীক। রাস মানে অপ্রাকৃত আনন্দ, রাসলীলা সেই আনন্দের লীলাময় প্রকাশ, আর রাসতত্ত্ব হলো সেই প্রেমের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক স্বরূপ। যিনি এই লীলা শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে অনুধাবন করেন, তিনি বুঝতে পারেন যে ভগবানের সঙ্গে সম্পর্কই জীবনের পরম লক্ষ্য। রাসলীলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সত্যিকারের প্রেম স্বার্থহীন, নিঃস্বার্থ এবং অনন্ত।
এই তত্ত্ব আজও ভক্তদের হৃদয়ে প্রেরণা জোগায় এবং ভক্তিমার্গের শীর্ষস্থানীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

মন্তব্য করুন