
মহাভারতের আদিপর্বে (সম্ভবত ৭৬-৮০ অধ্যায়ের কাছাকাছি) এই কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এটি দেবাসুর যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পটভূমি
দেবতা ও অসুরদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধ চলছিল। অসুরদের গুরু শুক্রাচার্য (উশনা) মৃত অসুরদের মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা দিয়ে পুনর্জীবিত করতেন। ফলে দেবতারা বারবার হেরে যাচ্ছিলেন। দেবতাদের গুরু বৃহস্পতির পুত্র “কচ”কে দেবরাজ ইন্দ্রের আদেশে শুক্রাচার্যের কাছে পাঠানো হয় এই বিদ্যা শেখার জন্য।
কাহিনির বিস্তারিত বর্ণনা
১. কচের আগমন:
কচ শুক্রাচার্যের আশ্রমে গিয়ে নিজেকে বৃহস্পতির পুত্র বলে পরিচয় দেন এবং শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি শুক্রাচার্যের সেবা করতে থাকেন। শুক্রাচার্যের একমাত্র কন্যা দেবযানী কচের রূপ, গুণ ও সেবাপরায়ণতায় মুগ্ধ হয়ে পড়েন।
২. অসুরদের আক্রমণ:
অসুরেরা জানতে পেরে কচকে বারবার হত্যা করে। প্রথমবার তাকে জঙ্গলে নিয়ে হত্যা করে পুড়িয়ে ছাই করে।
দেবযানী কচের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে বাবাকে বলেন তাকে বাঁচাতে। শুক্রাচার্য মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা প্রয়োগ করে কচকে জীবিত করেন।
দ্বিতীয়বার অসুরেরা কচকে হত্যা করে তার দেহ মদের সঙ্গে মিশিয়ে শুক্রাচার্যকে খাইয়ে দেয়। এবারও দেবযানীর অনুরোধে শুক্রাচার্য কচকে উদর থেকে বের করে জীবিত করেন।
৩. বিদ্যালাভ:
এভাবে কচ শেষ পর্যন্ত সহস্র বছর কাটিয়ে মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত করেন।
৪. বিদায় ও অভিশাপ (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ):
বিদ্যা শেখার পর কচ দেবলোকে ফিরে যেতে চান।
দেবযানী কচকে বিয়ে করতে চান এবং বলেন, “তুমি আমার স্বামী হও।”
কচ প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর যুক্তি:
তুমি গুরুর কন্যা, অতএব আমার বোনতুল্য।
আমি গুরুর ঘরে থেকে বিদ্যা শিখেছি, গুরুপুত্রীর সঙ্গে বিবাহ করা অনুচিত।
দেবযানী ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেন: “তুমি যে বিদ্যা শিখেছ, তা তোমার কোনো কাজে লাগবে না।”
কচও প্রত্যাভিশাপ দেন: “তোমার অভিশাপ পূর্ণ হোক। কিন্তু আমি যে বিদ্যা শিখেছি, তা অন্যদের শেখাতে পারব।
আর তুমি কোনো ব্রাহ্মণকে স্বামী হিসেবে পাবে না। তোমার ইচ্ছা অনুসারে কোনো ব্রাহ্মণ তোমাকে বিয়ে করবে না।”
পরবর্তী ঘটনা (সংক্ষেপে)
দেবযানী পরে যয়াতির (চন্দ্রবংশীয় রাজা) সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়েন এবং শর্মিষ্ঠার সঙ্গে ত্রিভুজ প্রেম-বিবাহ-অভিশাপের কাহিনি ঘটে, যা যয়াতি-উপাখ্যানের অংশ।
এই কাহিনিতে গুরু-শিষ্য সম্পর্ক, কর্তব্য, প্রেমের একতরফা আকাঙ্ক্ষা, অভিশাপের শক্তি এবং দেবাসুর সংঘাত ফুটে উঠেছে। কচ শেষ পর্যন্ত দেবতাদের জন্য বিদ্যা নিয়ে ফিরে যান এবং দেবতাদের শক্তিশালী করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিদায়-অভিশাপ কাব্যনাট্যে এই কাহিনির শেষাংশ (বিদায় দৃশ্য) অবলম্বনে একটি মধুর-বেদনাময় প্রেমের গল্প সৃষ্টি করেছেন, যেখানে অসুর-হত্যা ইত্যাদি জটিলতা বাদ দিয়ে মানসিক দ্বন্দ্ব ও আবেগকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “বিদায়-অভিশাপ” (রচনা: ১৩০০ বঙ্গাব্দ, শ্রাবণ মাসে কালীগ্রামে) মহাভারতের কচ-দেবযানীর পুরাণকাহিনি অবলম্বনে রচিত একটি সুন্দর কাব্যনাট্য বা নাট্যকবিতা। এটি চিত্রাঙ্গদা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।
কাহিনির সারাংশ :
দেবতাদের গুরু বৃহস্পতির পুত্র কচ দেবগণের আদেশে অসুরদের গুরু শুক্রাচার্যের কাছে মৃতসঞ্জীবনী বিদ্যা শিখতে যান। শুক্রাচার্যের আশ্রমে তিনি সহস্র বছর অতিবাহিত করেন। সেখানে শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। কচ নৃত্য-গীত-বাদ্যের মাধ্যমে দেবযানীর মনোরঞ্জন করেন এবং গুরুর কৃপায় বিদ্যা লাভ করে সফল হন।
কাহিনিটি মূলত বিদায়ের দৃশ্যে কেন্দ্রীভূত। বিদ্যালাভের পর কচ দেবলোকে ফিরে যাওয়ার সময় দেবযানীর সঙ্গে বিদায়-সংলাপ ঘটে। এই সংলাপের মধ্য দিয়ে ট্যাগোর অসাধারণ কাব্যিকতায় প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, কর্তব্য ও বিরহের রস ফুটিয়ে তুলেছেন।
বিদায় দৃশ্যের মূল ঘটনা:
কচ আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বিদায় নিতে চান। তিনি বলেন, তাঁর জীবন পূর্ণ হয়েছে, আর কোনো কামনা নেই।
দেবযানী তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করেন। তিনি বনভূমি, বটতল, হোমধেনু, স্রোতস্বিনীসহ আশ্রমের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি কচের প্রথম আগমনের দিন, তাঁর সৌন্দর্য ও তাঁদের দীর্ঘ সহচর্যের কথা বলেন। দেবযানীর কথায় স্পষ্ট হয় যে, তিনি কচকে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলেছেন এবং তাঁর চলে যাওয়া সহ্য করতে পারছেন না।
কচ কর্তব্যপরায়ণ। তিনি দেবযানীকে শ্রদ্ধা ও স্নেহ করেন, কিন্তু প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন না (কারণ তিনি গুরুপুত্র এবং দেবযানীকে বোনের মতো দেখেন বা তাঁর মিশনের প্রতি আনুগত্য)। তিনি সবকিছু স্মরণে রাখার প্রতিশ্রুতি দেন কিন্তু চলে যেতে চান।
এই প্রত্যাখ্যানে অভিমানে জ্বলে উঠে দেবযানী কচকে অভিশাপ দেন যে, তিনি যে বিদ্যা শিখেছেন তা নিজে প্রয়োগ করতে পারবেন না (শুধু অন্যকে শেখাতে পারবেন)। কচও প্রত্যুত্তরে দেবযানীকে অভিশাপ দেন যে, তাঁর এই সহস্র বছরের স্মৃতি দেবযানী কখনো ভুলতে পারবেন না।
ট্যাগোরের সংযোজন ও বৈশিষ্ট্য
মহাভারতে কচ-দেবযানীর কাহিনি আরও জটিল ও অভিশাপ-প্রত্যাভিশাপে ভরা (অসুররা কচকে বারবার হত্যা করে, শুক্রাচার্যের উদর থেকে কচকে উদ্ধার ইত্যাদি)। ট্যাগোর এটিকে সরল করে অসম্পূর্ণ, করুণ প্রেমের একটি মধুর-বেদনাময় গল্পে পরিণত করেছেন। এখানে প্রধানত দুই চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক সংলাপ, প্রকৃতির সৌন্দর্য ও আবেগের গভীরতা ফুটে ওঠে। এটি প্রেমের একতরফা আকুলতা ও কর্তব্যের দ্বন্দ্বের চমৎকার চিত্র।
এই কাব্যনাট্যটি বাংলা সাহিত্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রায়ই আবৃত্তি বা মঞ্চায়িত হয়। এর কাব্যিক ভাষা, ছন্দ ও আবেগের গভীরতা অসাধারণ।









