
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষষ্ঠ অধ্যায় (ধ্যানযোগ) মূলত ধ্যান, মনসংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণের উপর কেন্দ্রীভূত। তবে শ্রদ্ধেয় একজন পাঠক যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন—ভগবানের অপরা (জড়/নিম্ন) প্রকৃতি ও পরা (চৈতন্য/উচ্চ) প্রকৃতি, এবং সর্বত্র ভগবানের প্রকাশ ও বিভূতি—এগুলো প্রধানত সপ্তম অধ্যায় (জ্ঞানবিজ্ঞানযোগ) এবং দশম অধ্যায় (বিভূতিযোগ)-এ বিস্তারিত আলোচিত।
ষষ্ঠ অধ্যায়ে এর সরাসরি বিবরণ নেই, কিন্তু ধ্যানযোগের মাধ্যমে এই তত্ত্বগুলো উপলব্ধি করার পথ প্রস্তুত করা হয়েছে। আমি ষষ্ঠ অধ্যায়ের প্রেক্ষাপটে এবং সম্পর্কিত অধ্যায়গুলোর আলোকে বিশ্লেষণ করব।
১. ভগবানের অপরা (জড়) ও পরা (চৈতন্য) প্রকৃতি
সপ্তম অধ্যায়ের ৪-৫ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ এই দ্বৈত প্রকৃতির বর্ণনা দিয়েছেন:-
অপরা প্রকৃতি (নিম্ন/জড় প্রকৃতি): পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহংকার—এই আটটি উপাদান নিয়ে গঠিত। এটি জড় জগতের ভিত্তি, যা মায়ার অধীন, পরিবর্তনশীল এবং ক্ষণস্থায়ী। এর মধ্যে তিন গুণ (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) কাজ করে।
পরা প্রকৃতি (উচ্চ/চৈতন্য প্রকৃতি): জীবশক্তি বা আত্মা, যা চৈতন্যময়। এটি জড় প্রকৃতিকে ধারণ করে এবং জীবনের ভিত্তি। এটি ভগবানের উচ্চতর শক্তি, যা অবিনাশী এবং চেতনাস্বরূপ।
বিশ্লেষণ: সমস্ত জীব এই দুই প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত। ভগবান বলেন, “এই দুই প্রকৃতি থেকেই সমস্ত সৃষ্টি প্রকাশিত হয় এবং আমাতেই লয় পায়।” (৭.৬) অপরা প্রকৃতি মায়ারূপে জীবকে বন্ধনে আবদ্ধ করে, কিন্তু পরা প্রকৃতি (আত্মা) মুক্তির পথ দেখায়। মায়া দুর্লঙ্ঘ্য, কিন্তু ভগবানে আত্মসমর্পণ করলে তা অতিক্রম করা যায়।
ষষ্ঠ অধ্যায়ের সংযোগ: ধ্যানযোগে মনকে জয় করে জড় (অপরা) প্রকৃতির প্রভাব থেকে উঠে পরা প্রকৃতি (আত্মা/পরমাত্মা)-তে স্থিত হওয়ার পথ দেখানো হয়েছে। যোগী “জিতাত্মা” (মন জয়কারী) হয়ে শীত-উষ্ণ, সুখ-দুঃখ, মান-অপমানে সমদর্শী হন (৬.৭)।
২. সর্বত্র ভগবানের প্রকাশ ও বিভূতি
দশম অধ্যায় (বিভূতিযোগ)-এ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অসংখ্য বিভূতি (ঐশ্বর্য, প্রকাশ) বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: “আমি সকল প্রাণীর হৃদয়ে অবস্থিত, আমিই সকলের আদি, মধ্য ও অন্ত।”
বিভূতির উদাহরণ: সূর্যের মধ্যে আমি সূর্য, বেদের মধ্যে সামবেদ, মনের মধ্যে মন, পর্বতের মধ্যে হিমালয়, নদীর মধ্যে গঙ্গা, যোদ্ধাদের মধ্যে রাম ইত্যাদি। যা কিছু শক্তিশালী, সুন্দর, ঐশ্বর্যপূর্ণ—সবই তাঁর এক কণা প্রকাশ মাত্র (১০.৪১)।
দর্শন: ভগবান সর্বব্যাপী। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর থেকে উদ্ভূত, তাঁতেই বিদ্যমান এবং তাঁতেই লীন হয়। এটি অদ্বৈতবাদের সাথে যুক্ত—সবকিছুতে ঈশ্বর দেখা (সর্বত্র ভগবানের দর্শন)।
ষষ্ঠ অধ্যায়ের সংযোগ: ধ্যানের মাধ্যমে যোগী এই সর্বব্যাপী ভগবানকে উপলব্ধি করেন। তিনি “মচ্চিত্তো” (ভগবানে চিত্ত নিবদ্ধ) হয়ে শান্তি লাভ করেন (৬.১৪-১৫)।
দর্শন (Philosophy):-
দ্বৈত-অদ্বৈত সমন্বয়: অপরা প্রকৃতি জড় জগতের বৈচিত্র্য দেখায়, পরা প্রকৃতি ঐক্যের (চৈতন্যের) দিকে নির্দেশ করে। ভগবান উভয়ের উৎস এবং অতীত।
মায়া ও মুক্তি: জড় প্রকৃতি (মায়া) দ্বারা বন্ধন, কিন্তু ভক্তি, জ্ঞান ও ধ্যান দ্বারা মুক্তি সম্ভব।
সর্বত্র ঈশ্বর: বিভূতি দেখিয়ে গীতা প্যানথেইজমের (সবকিছুতে ঈশ্বর) আভাস দেয়, কিন্তু ব্যক্তিগত ভগবান (কৃষ্ণ)-এর উপর জোর দেয়। এটি ভক্তিকে উৎসাহিত করে।
ষষ্ঠ অধ্যায়ের যোগ: কর্মফলাসক্তি ত্যাগ করে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা (যোগারূঢ় অবস্থা) এই দর্শন উপলব্ধির সাধনা।
শিক্ষা (Teachings)
মনসংযম: মন জয় করলে তা বন্ধু, না জয় করলে শত্রু (৬.৫-৬)। পরিমিত আহার, নিদ্রা, কর্ম—সমতা রক্ষা করুন (৬.১৬-১৭)।
ধ্যানের পদ্ধতি: নির্জনে, স্থির আসনে, নাসিকাগ্রে দৃষ্টি রেখে, চিত্ত একাগ্র করে ভগবানে ধ্যান (৬.১০-১৫)। ফল: আত্মশুদ্ধি ও শান্তি।
সমদর্শিতা: সকলের প্রতি সমবুদ্ধি (৬.৯), জড় বিষয়ে সমতা (৬.৮)।
ভগবানকেন্দ্রিক জীবন: অপরা থেকে উঠে পরা প্রকৃতিতে স্থিত হোন। সর্বত্র ভগবান দেখে ভক্তি করুন—এটি জীবনকে অর্থপূর্ণ করে।
প্রায়োগিক: দৈনন্দিন জীবনে কর্তব্য পালন করুন কিন্তু ফলাসক্তি ত্যাগ করুন; ধ্যানের অভ্যাসে মন শান্ত রাখুন।
ষষ্ঠ অধ্যায় ধ্যানের ব্যবহারিক পথ দেখায়, যার মাধ্যমে সপ্তম ও দশম অধ্যায়ের গভীর দর্শন (প্রকৃতি ও বিভূতি) অনুভব করা যায়। এর শিক্ষা হলো—জড় থেকে চৈতন্যে উত্তরণ এবং সর্বত্র ঈশ্বরের উপস্থিতি উপলব্ধি করে মুক্তি ও শান্তি লাভ।









