
দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সমাজের অন্যতম প্রধান উৎসব। এই পূজার অনেক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে নবপত্রিকা একটি বিশেষ ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ অঙ্গ। নবপত্রিকা শুধুমাত্র নয়টি উদ্ভিদের সমষ্টি নয়; এটি দেবী দুর্গার নানা রূপের প্রতীক, প্রকৃতির উর্বরতা ও শস্যের দেবীমূর্তি এবং শারদীয়া পূজার প্রাচীন কৃষিভিত্তিক উৎসের সাক্ষ্য বহন করে।
নবপত্রিকা কী ও এর বিবরণ
‘নবপত্রিকা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘নয়টি পাতা’ বা ‘নয়টি উদ্ভিদ’। শাস্ত্রীয় শ্লোকে এর উল্লেখ পাওয়া যায়:
“রম্ভা কচ্চী হরিদ্রা চ জয়ন্তী বিল্বদাড়িমৌ।
অশোকা মানকঞ্চৈব ধান্যঞ্চ নবপত্রিকা॥”
অর্থাৎ নবপত্রিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়টি উদ্ভিদ হলো:
কদলী বা রম্ভা (কলাগাছ)
কচু (কচ্চী)
হরিদ্রা (হলুদগাছ)
জয়ন্তী
বিল্ব (বেল)
দাড়িম্ব (ডালিম)
অশোক
মানকচু (মান)
ধান্য (ধান)
একটি সপত্র কলাগাছের সঙ্গে অপর আটটি সমূল সপত্র উদ্ভিদ একত্র করে একজোড়া বেলফলসহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বাঁধা হয়। এরপর লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া নববধূর আকার দেওয়া হয়। দুটি বেল দিয়ে স্তনযুগলের প্রতীক তৈরি করা হয়। এভাবে সাজানো নবপত্রিকাকে প্রচলিত ভাষায় ‘কলাবৌ’ বলা হয়।
মহাসপ্তমীর সকালে নদী বা জলাশয়ে (বা মন্দিরে) নবপত্রিকাকে স্নান করানো হয়। স্নানের পর নতুন শাড়ি পরিয়ে পূজামণ্ডপে নিয়ে এসে দেবীর ডানদিকে কাষ্ঠসিংহাসনে স্থাপন করা হয়। নবপত্রিকা প্রবেশের মাধ্যমেই দুর্গাপূজার মূল অনুষ্ঠানের প্রথাগত সূচনা হয়। এরপর দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয় এবং নবপত্রিকাকে অন্যান্য দেবদেবীর সঙ্গে পূজা করা হয়।
বিশেষত্ব:
নবপত্রিকার প্রধান বিশেষত্ব হলো এর প্রতীকী তাৎপর্য। প্রতিটি উদ্ভিদকে দেবী দুর্গার একটি বিশেষ রূপের অধিষ্ঠান বলে কল্পনা করা হয়:
কলায় -ব্রহ্মাণী
কচুতে -কালিকা
হলুদে -উমা/দুর্গা
জয়ন্তীতে- কার্ত্তিকী
বেলে- শিবা
ডালিমে -রক্তদন্তিকা
অশোকে -শোকরহিতা
মানকচুতে -চামুণ্ডা
ধানে -লক্ষ্মী
এই নয় দেবী একত্রে “নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা” নামে পূজিতা হন।
মন্ত্র: “নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ”।
অনেকে ভুলবশত নবপত্রিকাকে গণেশের স্ত্রী মনে করেন। কিন্তু শাস্ত্রমতে এটি গণেশের স্ত্রী নয়। হিন্দু লোকাচারে স্ত্রী স্বামীর বামদিকে থাকেন, কিন্তু নবপত্রিকা গণেশের ডানদিকে স্থাপিত হয়। এটি দুর্গারই সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশী শক্তিরূপ। পুরোহিত-দর্পণে উল্লেখ আছে যে সপ্তমীর সকালে বাদ্যধ্বনিসহ বিল্বশাখা ও নবপত্রিকা নিয়ে পূজালয়ে প্রবেশ করতে হয়।
নবপত্রিকার আরেকটি বিশেষত্ব হলো এর কৃষি ও প্রকৃতি-সংযোগ। এটি শস্যদেবীর পূজার প্রতীক। শারদীয়া ঋতুতে ফসল তোলার সময় এই পূজার মাধ্যমে প্রকৃতির উর্বরতা, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। অনেক উদ্ভিদের আয়ুর্বেদিক গুণও রয়েছে, যা রোগ-ব্যাধি নিবারণের সঙ্গে যুক্ত।
মাহাত্ম্য ও শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ
নবপত্রিকার মাহাত্ম্য বহুস্তরবিশিষ্ট। প্রথমত, এটি দেবী দুর্গার নবরূপের মিলন। প্রতিটি উদ্ভিদ দেবীর একটি শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে এবং একত্রে নবদুর্গারূপী মহাশক্তির আবাহন ঘটে।
দ্বিতীয়ত, এটি প্রাচীন শস্যদেবী পূজার ধারাবাহিকতা। গবেষকদের মতে (যেমন শশিভূষণ দাশগুপ্ত), শারদীয়া দুর্গাপূজার মূলে ছিল শস্যদেবীর আরাধনা। পরবর্তীকালে পৌরাণিক দুর্গার সঙ্গে একে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেবীপুরাণে নবদুর্গার উল্লেখ থাকলেও নবপত্রিকার সরাসরি উল্লেখ নেই; মার্কণ্ডেয় পুরাণেও নেই। কালিকাপুরাণে সপ্তমীতে পত্রিকাপূজার কথা আছে। কৃত্তিবাসী রামায়ণে এর প্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি বৈদিক ও লোকাচারের সুন্দর মিশ্রণ।
তৃতীয়ত, নবপত্রিকা প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক। বৃক্ষ, শস্য ও ঔষধি উদ্ভিদের পূজার মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করে। এটি পরিবেশ-চেতনা ও কৃষিজীবনের সঙ্গে ধর্মের গভীর সংযোগ স্থাপন করে।
চতুর্থত, পূজার আচার হিসেবে এর মাহাত্ম্য অপরিসীম। নবপত্রিকা স্নান ও প্রবেশের পরই দেবীর প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও মূল পূজা শুরু হয়। এটি দেবীকে জাগ্রত করে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভের প্রতিষ্ঠার প্রতীক।
সংক্ষেপে, নবপত্রিকা দুর্গাপূজার প্রাণকেন্দ্র। এটি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, প্রকৃতি, শস্য, শক্তি ও সমৃদ্ধির সম্মিলিত প্রতীক। নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গার আরাধনার মাধ্যমে ভক্তরা দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন, যাতে জীবনে সুখ, শান্তি, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি বজায় থাকে। এই প্রাচীন ঐতিহ্য আজও বাঙালি সংস্কৃতিতে জীবন্ত হয়ে আছে এবং দুর্গাপূজাকে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তোলে।
শুভ সকাল, শুভ প্রণাম।









