
হিন্দু ধর্মে শাস্ত্র অনুসারে সপ্তাহের বিভিন্ন বার (দিন) এবং বছরের বিভিন্ন মাসের নামকরণ জ্যোতিষশাস্ত্র, পুরাণ ও বেদ-সংশ্লিষ্ট গ্রন্থের (যেমন সূর্যসিদ্ধান্ত, আর্যভটীয়, ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ ইত্যাদি) উপর ভিত্তি করে হয়েছে। এগুলো কেবল নাম নয়, বরং প্রত্যেকটির সঙ্গে জড়িত দেবতা, গ্রহ-নক্ষত্র ও আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য রয়েছে। নিচে বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো।
সপ্তাহের সাত দিনের (বার) নামকরণ ও মাহাত্ম্য
হিন্দু জ্যোতিষশাস্ত্রে সপ্তাহের সাত দিন নবগ্রহ (সূর্য, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি)-এর নামে নামকরণ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা প্রাচীনকালে (গুপ্ত যুগের দিকে) চালু হয়। প্রতি দিনের প্রথম ঘণ্টা (হোরা) যে গ্রহের অধীনে থাকে, সেই গ্রহের নামেই পুরো দিনের নাম হয় (সূর্যসিদ্ধান্ত ও আর্যভটীয় অনুসারে)।
রবিবার (আদিত্যবার / রবিবার): সূর্যদেবের নামে। সূর্যকে আদিত্য বা রবি বলা হয়। তিনি জ্যোতির্ময়, জীবনের আলো ও শক্তির উৎস। পুরাণে সূর্য কশ্যপ ও অদিতির পুত্র। মাহাত্ম্য: এই দিন সূর্যপূজা, আরোগ্য ও তেজ বৃদ্ধি হয়। সূর্যনারায়ণের আরাধনায় পাপমোচন ও আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ হয়।
সোমবার (সোমবার): চন্দ্রের (সোম) নামে। চন্দ্র অত্রি ঋষির পুত্র, শিবের মস্তকে অবস্থিত। মাহাত্ম্য: মনের শান্তি, মানসিক স্থিরতা ও ভক্তির দিন। শিবপূজার বিশেষ দিন—সোমবারে শিবলিঙ্গে দুধ অর্পণ করলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়।
মঙ্গলবার: মঙ্গল গ্রহের নামে (যুদ্ধ ও সাহসের দেবতা)। মাহাত্ম্য: শক্তি, সাহস ও বিজয়ের দিন। হনুমানজীর পূজা করা হয়—ভক্তি, নির্ভয়তা ও শত্রুনাশ হয়। বিবাহ বা মাঙ্গলিক কাজে শুভ।
বুধবার: বুধ গ্রহের নামে (চন্দ্রের পুত্র, বুদ্ধি ও বাণিজ্যের দেবতা)। মাহাত্ম্য: জ্ঞান, বুদ্ধি ও ব্যবসায়িক সাফল্যের দিন। বুধদেবের আরাধনায় মেধা বৃদ্ধি ও সংকটমোচন হয়।
বৃহস্পতিবার (গুরুবার): বৃহস্পতি গ্রহের নামে (দেবগুরু, জ্ঞান ও ধর্মের প্রতীক)। মাহাত্ম্য: শিক্ষা, ধর্ম ও সমৃদ্ধির দিন। বৃহস্পতিদেব বা বিষ্ণুর পূজা করলে জ্ঞানলাভ ও সন্তানসুখ হয়।
শুক্রবার: শুক্র গ্রহের নামে (দৈত্যগুরু, প্রেম ও সম্পদের দেবতা)। মাহাত্ম্য: সৌন্দর্য, প্রেম, বিবাহ ও ধনলাভের দিন। লক্ষ্মীদেবীর পূজা বিশেষ ফলপ্রসূ। শুভ কাজের জন্য শ্রেষ্ঠ।
শনিবার: শনি গ্রহের নামে (সূর্যের পুত্র, কর্মফলের দেবতা)। মাহাত্ম্য: ন্যায়, শৃঙ্খলা ও কর্মফলের দিন। শনিদেবের পূজা (তেল, কালো বস্ত্র দান) করে শনিদোষ নিবারণ হয়। ধৈর্য ও সংযমের পরীক্ষা নেয়।
এই নামকরণের পেছনে জ্যোতিষীয় যুক্তি রয়েছে—দিনের ২৪ ঘণ্টার প্রথম ঘণ্টা যে গ্রহের অধীনে থাকে, সেই গ্রহই দিনের অধিপতি হয়।
বছরের বার মাসের নামকরণ ও মাহাত্ম্য
হিন্দু পঞ্জিকায় (চান্দ্র-সৌর পদ্ধতি) মাসের নাম ২৭ নক্ষত্র থেকে এসেছে। প্রতি মাসের পূর্ণিমায় চন্দ্র যে নক্ষত্রে অবস্থান করে (বা তার কাছাকাছি), সেই নক্ষত্রের নামেই মাসের নামকরণ হয়েছে। এটি সূর্যসিদ্ধান্ত ও পুরাণে বর্ণিত। বাংলা/হিন্দি পঞ্জিকায় মাসগুলো নিম্নরূপ (সৌর/চান্দ্র অনুসারে):
বৈশাখ: বিশাখা নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: নববর্ষের প্রথম মাস। গঙ্গাস্নান, বৈশাখী উৎসব। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পুণ্যলাভ।
জ্যৈষ্ঠ: জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: গ্রীষ্মের মাস। জলদান, তীর্থযাত্রা। শান্তি ও তপস্যার সময়।
আষাঢ়: উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: বর্ষাকালের শুরু। জগন্নাথ রথযাত্রা। ভক্তি ও বৈরাগ্যের মাস।
শ্রাবণ: শ্রবণা নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: শিবের মাস। শ্রাবণী পূর্ণিমায় রক্ষাবন্ধন, শিবপূজা। বৃষ্টি ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
ভাদ্র: পূর্বভাদ্রপদ নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: উৎসবমুখর। জন্মাষ্টমী (কৃষ্ণভক্তি)। শ্রাদ্ধ ও পিতৃতর্পণ।
আশ্বিন: অশ্বিনী নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: দুর্গাপূজা, নবরাত্রি। বিজয়া দশমী—শক্তির আরাধনা।
কার্তিক: কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: দীপাবলি, কার্তিক পূর্ণিমা। লক্ষ্মী-গণেশ পূজা। পবিত্রতার মাস।
অগ্রহায়ণ (মার্গশীর্ষ): মৃগশিরা নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: শীতের শুরু। গীতা জয়ন্তী। ধর্মশাস্ত্র পাঠ।
পৌষ: পুষ্যা নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: সূর্যপূজা, মকরসংক্রান্তি (পৌষ সংক্রান্তি)। দান-ধ্যানের সময়।
মাঘ: মঘা নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: মাঘস্নান, বসন্তপঞ্চমী (সরস্বতী পূজা)। পুণ্যস্নানে পাপমোচন।
ফাল্গুন: উত্তরফাল্গুনী নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: হোলি, শিবরাত্রি। প্রেম ও আনন্দের উৎসব।
চৈত্র: চিত্রা নক্ষত্র থেকে। মাহাত্ম্য: রামনবমী, বছরের শেষ মাস। নববর্ষের প্রস্তুতি।
এই মাসগুলোতে বিভিন্ন উৎসব ও ব্রত পালন করলে বিশেষ ফল হয়—যেমন শ্রাবণে শিবভক্তি, আশ্বিনে শক্তিপূজা, কার্তিকে লক্ষ্মী আরাধনা। অধিক মাস (মল মাস বা পুরুষোত্তম মাস) বিষ্ণুর নামে, যা পুণ্য অর্জনের জন্য অতিরিক্ত সুযোগ দেয়।
হিন্দু শাস্ত্রে এই নামকরণগুলো শুধু সময়-গণনার জন্য নয়, বরং মানুষকে গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব স্মরণ করিয়ে ধর্ম, কর্ম ও ভক্তির পথে চালিত করে। প্রতিটি দিন ও মাসে নির্দিষ্ট দেবতার পূজা-উপাসনা করে আমরা সেই মাহাত্ম্য লাভ করতে পারি।









