শুভ মহালয়া

মহালয়া শব্দটির সাথে বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি, এবং শারদীয়া দুর্গোৎসবের প্রাক্‌-আনন্দ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ভাদ্র মাসের পূর্ণিমার পর থেকে শুরু হওয়া পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে আশ্বিন বা অনেক সময় কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে মহালয়া পালিত হয়। এই বিশেষ দিনটিকে সনাতন ধর্মে অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়, কারণ এটি একদিকে যেমন প্রয়াত পিতৃপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর এবং তর্পণ করার সর্বশ্রেষ্ঠ দিন, অন্যদিকে তেমনি দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের সূচনা বা দেবীপক্ষের শুভ সূচনা হিসেবে পরিগণিত হয়। দীর্ঘ এক মাস ধরে চলা পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ঘটে মহালয়ার ভোরে, আর সেই সাথেই শুরু হয় শক্তির আরাধনার কাউন্টডাউন। ভোরের আলো ফোটার আগে রেডিওর আকাশবাণী থেকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ ও মহিষাসুরমর্দিনী শোনার যে আবেগ, তা বাঙালির মনস্তত্ত্বে এক গভীর অনুরণন সৃষ্টি করে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। মহালয়ার এই আবহমান ধারা কেবল একটি ধর্মীয় আচার বা অনুষ্ঠান মাত্র নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির এক অনবদ্য ও অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের গণ্ডি পেরিয়ে এক সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। মহালয়া কেন উদযাপিত হয়, এর পেছনে রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক পটভূমি যা মানবজীবন, কর্মফল এবং সৃষ্টির রহস্যের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
মহালয়ার উদযাপনের পেছনে প্রধানত দুটি বড় পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক কারণ কাজ করে—প্রথমটি পিতৃপুরুষদের তর্পণ ও মুক্তি সংক্রান্ত এবং দ্বিতীয়টি মহাশক্তির উৎস দেবী দুর্গার আবির্ভাব ও মহিষাসুর বধের প্রস্তুতি পর্ব। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, পিতৃপক্ষে আমাদের পূর্বপুরুষদের আত্মা মর্ত্যলোকে নেমে আসেন এবং তাদের বংশধরদের কাছ থেকে জল ও তিল অঞ্জলি প্রার্থনা করেন। এই পক্ষটিকে ‘মহালয়া’ বা ‘মহালয়া অমাবস্যা’ বলা হয় কারণ এই অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপুরুষদের আত্মা তাদের নিজ লোকে ফিরে যান। মহাভারতের কাহিনী অনুযায়ী, দানবীর কর্ণ মৃত্যুর পর স্বর্গে গেলে তাকে সোনা ও রত্ন খেতে দেওয়া হয়। এর কারণ হিসেবে তিনি জানতে পারেন যে সারাজীবন তিনি সোনা ও রত্ন দান করেছেন কিন্তু পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে কখনোই অন্ন বা জল দান করেননি। তখন দেবরাজ ইন্দ্র তাকে পনেরো দিনের জন্য মর্ত্যে ফিরে গিয়ে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল তর্পণ করার সুযোগ দেন। এই পনেরো দিনই পিতৃপক্ষ বা মহালয়া পক্ষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মহালয়ার দিন নদী বা জলাশয়ের তীরে দাঁড়িয়ে তর্পণ করার মাধ্যমে প্রয়াত পিতৃপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়, যাতে তারা পরম শান্তি লাভ করেন এবং তাদের ঋণ থেকে মুক্ত হওয়া যায়।

মন্তব্য করুন