শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মূল শিক্ষা-ড. শ্রীপতি দাশ

আমাদের জীবন জড়াশক্তি অথবা চিৎশক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। জড়জগতের প্রতি মোহ সৃষ্টিকারী সাহিত্য পাঠ ও বিবিধ অডিও-ভিজ্যুয়েল দেখার কারণে আমরা উচ্চতর চিৎশক্তি কি তা উপলব্ধিতে অক্ষম হই। এই জড়াসক্তিকে চিৎশক্তিতে রূপান্তরিত করতে হলে আমাদের বৈদিক সাহিত্যের শরণাপন্ন হতে হবে, যা মানুষের কল্পনাপ্রসূত নয়, বরং তা ভগবানের করুণা। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে বলা হয়েছে—’মায়ামুগ্ধ জীবেরে নাহি সতত কৃষ্ণজ্ঞান। জীবেরে কৃপায় কৈলা কৃষ্ণ বেদ-পুরাণ।।’
স্মৃতিভ্রষ্ট জীবদের ভগবানের সঙ্গে শাশ্বত সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে অপ্রাকৃত স্তরে মনকে উন্নীত করার জন্য ব্যাসদেব বেদ, পুরাণ, মহাভারত এবং বেদান্ত সূত্র রচনা করেন। মহাভারতের অংশ এই ভগবদ্গীতায় তিনি মূল শিক্ষাটি দেন।
বৈদিক সাহিত্য অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা ভগবান, তাঁর স্বরূপ এবং তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক জানতে পারি। এই শাস্ত্রগুলি মনকে ভগবৎমুখী করে তোলে, যার ফলস্বরূপ অন্তিমকালে ভগবানের সচ্চিদানন্দময় রূপের ধ্যান করতে করতে আমরা দেহত্যাগ করে তাঁর কাছে ফিরে যেতে পারি।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিঃসংশয়ে বলেছেন, “তস্মাৎ সর্বেষু কালেষু মামনুস্মর যুদ্ধ্য চ।
ময়্যার্পিতমনোবুদ্ধির মামেবৈশ্যসংশয়।।” (গীতা ৮.৭) অর্থাৎ, “অতএব, অর্জুন, সর্বক্ষণ আমাকে স্মরণ করে তোমার স্বভাববিহিত যুদ্ধ করা উচিত। তোমার মন ও বুদ্ধি আমাতে অর্পণ করে কর্ম করলে নিঃসন্দেহে তুমি আমার কাছে ফিরে আসবে।”
তিনি অর্জুনকে কর্তব্যকর্ম (যুদ্ধ) ত্যাগ করে ধ্যান করতে বলেননি। এই জড়জগতে জন্ম নিলে প্রত্যেককেই কর্ম করতে হবে—তা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্র যেই হোক না কেন। ভগবান অর্জুনকে তাঁর সমস্ত কর্মের মাঝেও তাঁকে স্মরণ করতে আদেশ করেছেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও একই উপদেশ দিয়েছেন— ‘কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ’। ভগবানের দিব্য রূপ ও নাম অভিন্ন হওয়ায়, সর্বক্ষণ নাম-কীর্তন ও তাকে নিরন্তর স্মরণ একই ফলদায়ক।
সর্বক্ষণ ভগবানকে স্মরণ করা সম্ভব, ঠিক যেমন গভীর অনুরাগে আসক্ত ব্যক্তি সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থেকেও তার প্রেমাস্পদকে সর্বদা মনে রাখে। জাগতিক প্রেমাস্পদ -এর প্রতি যেমন অনেকে অন্ধ থাকেন, তেমনি ভগবানের প্রতি এই ধরনের গভীর অনুরাগের একান্ত প্রয়োজন।
যোগ সম্বন্ধে অর্জুন যখন মন চঞ্চল হওয়ার কারণে ভগবানের উপদেশ পালন করা অসম্ভব বলে জানান, তখন ভগবান তাকে বলেন, “যোগিনাম্ অপি সর্বেষাং মদগতেনান্তরাত্মনা। শ্রদ্ধাবান্ ভজতে যো মাং স মে যুক্ততমো মতঃ।।” (গীতা ৬.৪৭) অর্থাৎ, যিনি গভীর শ্রদ্ধাসহকারে কেবল তাঁকেই চিন্তা করেন এবং তাঁর সেবায় নিয়োজিত থাকেন, তিনিই যোগীশ্রেষ্ঠ।
ভগবানের ভাবনায় মন ও বুদ্ধি অর্পণ করে কর্তব্যকর্ম করলে আপাতদৃষ্টিতে জাগতিক ইন্দ্রিয়ের কর্মগুলি অপরিবর্তিত থাকলেও মনোবৃত্তির আমূল পরিবর্তন হয়ে ভক্তিভাবযুক্ত হয়ে যায়। মনকে কৃষ্ণ সেবায় নিযুক্ত করাই ভগবদ্গীতার মূল কৌশল ও রহস্য। এভাবে সর্বতোভাবে ভগবানের ভাবনায় নিমগ্ন হওয়ার ফলেই আমরা ভগবানের আলয়ে প্রবেশ করার যোগ্যতা অর্জন করি।

মন্তব্য করুন