
আমরা প্রতিদিন অসংখ্য কাজ করি, কিন্তু সব কাজের ফল এক নয়। গীতা সেই কাজকে তিন ভাগে ভাগ করেছে—কর্ম, অকর্ম এবং বিকর্ম।
১. কর্ম (ধর্মসম্মত কর্তব্য)
কর্ম হলো শাস্ত্রসম্মত, ন্যায়সঙ্গত এবং নিজের কর্তব্য অনুযায়ী করা কাজ। যেমন—সততার সঙ্গে জীবিকা অর্জন, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন, অন্যের উপকার করা এবং ঈশ্বরকে স্মরণ করে নিজের কর্তব্য পালন করা।
উদাহরণ হিসেবে একজন শিক্ষক যদি নিষ্ঠার সঙ্গে ছাত্রদের শিক্ষা দেন, একজন চিকিৎসক যদি সততার সঙ্গে রোগীর সেবা করেন, বা একজন কৃষক যদি পরিশ্রম করে খাদ্য উৎপাদন করেন—এসবই কর্ম।
২. অকর্ম (বন্ধনহীন কর্ম)
অকর্ম মানে অলস হয়ে বসে থাকা নয়। গীতার ভাষায় অকর্ম হলো এমন কর্ম, যা নিষ্কামভাবে, অর্থাৎ ব্যক্তিগত স্বার্থ ও ফলের আসক্তি ছাড়া, ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে করা হয়। এই ধরনের কর্ম মানুষকে কর্মফলের বন্ধনে আবদ্ধ করে না।
যেমন, কেউ যদি নিঃস্বার্থভাবে মানুষের সেবা করেন বা নিজের কর্তব্যকে ঈশ্বরের সেবা হিসেবে পালন করেন, তাহলে সেই কর্ম অকর্মে পরিণত হয়। বাইরে থেকে কাজটি সাধারণ কাজের মতোই মনে হতে পারে, কিন্তু তার আধ্যাত্মিক ফল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
৩. বিকর্ম (অধর্ম বা নিষিদ্ধ কাজ)
বিকর্ম হলো এমন কাজ, যা শাস্ত্রবিরোধী, অন্যায়, পাপপূর্ণ বা অন্যের ক্ষতিকর। যেমন—মিথ্যা বলা, প্রতারণা, চুরি, দুর্নীতি, অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জন, হিংসা বা নিরপরাধের ক্ষতি করা।
বিকর্ম মানুষের জীবনে দুঃখ, অশান্তি এবং ভবিষ্যতে কষ্টের কারণ হয়। গীতা মানুষকে বিকর্ম থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেয়।
কেন এই তিনটির পার্থক্য জানা জরুরি?
অনেক সময় বাইরে থেকে দুটি কাজ একই রকম মনে হতে পারে, কিন্তু উদ্দেশ্য ভিন্ন হওয়ায় ফলও ভিন্ন হয়। একজন ব্যক্তি দান করতে পারেন নাম-যশের জন্য, আবার অন্যজন দান করতে পারেন নিঃস্বার্থভাবে। বাহ্যিক কাজ একই হলেও, প্রথমটি কর্মফল সৃষ্টি করতে পারে, আর দ্বিতীয়টি অকর্মের পথে নিয়ে যেতে পারে।
তাই শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “গহনা কর্মণো গতিঃ”—কর্মের গতি অত্যন্ত গভীর। শুধু কাজ দেখলেই তার প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় না; উদ্দেশ্য, মানসিকতা এবং শাস্ত্রসম্মততা—সবকিছুই বিবেচ্য।
শিক্ষা :-
বর্তমান যুগে আমরা কর্মব্যস্ত জীবন যাপন করি। কিন্তু গীতা শেখায়, শুধু কাজ করাই যথেষ্ট নয়; কী উদ্দেশ্যে, কীভাবে এবং কোন নৈতিক ভিত্তিতে কাজ করছি, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি আমরা সততা, নিষ্ঠা এবং ঈশ্বরের স্মরণে কাজ করি, তাহলে সাধারণ কর্মও আধ্যাত্মিক সাধনায় পরিণত হতে পারে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিকর্ম ত্যাগ করে, কর্তব্যকর্মকে নিষ্কামভাবে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে সম্পাদন করা। তখনই কর্ম জীবনের বন্ধন না হয়ে মুক্তির পথ হয়ে উঠবে।









